শনিবার  ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩,   মাঘ ২১ ১৪২৯,  ১৩ রজব ১৪৪৪

Gazipur Kotha | গাজীপুর কথা

পাঠ্যবই নিয়ে উসকানি: ইসলাম বাদ দেয়ার ভয়ংকর গুজব

প্রকাশিত: ১০:৫৬, ২৫ জানুয়ারি ২০২৩

আপডেট: ১১:০২, ২৫ জানুয়ারি ২০২৩

পাঠ্যবই নিয়ে উসকানি: ইসলাম বাদ দেয়ার ভয়ংকর গুজব

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের ছবি পোস্ট করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

দেশের পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলাম ধর্ম বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের নাস্তিক বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে— এমন দাবি করে সম্প্রতি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে একটি গোষ্ঠী। এর মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে তারা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো এসব গুজবে আরও দাবি করা হচ্ছে- এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকার দেশকে মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করছে; প্রকৃতপক্ষে যার কোনো ভিত্তি নেই।

এসব দাবির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রকৃত বিষয়টি সামনে আসে। দেখা যায়, এসব গুজবে দেশের সরল মানুষ বেশ বিভ্রান্ত হচ্ছেন; বিব্রত হচ্ছেন সরকারি দলসংশ্লিষ্ট লোকজনও।

এই প্রতিবেদনে পাঠকদের জন্য গুজব ও বাস্তবতার প্রকৃতচিত্র তুলে ধরা হলো:

প্রচারিত এসব গুজবে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবই থেকে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর জীবনী বাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৭১ পৃষ্ঠায় ‘সবাই মিলে কাজ করি’ শিরোনামে মহানবী (সা.) এর জীবনীটি সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।  

তৃতীয় শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে হযরত আবু বকর (রা.) এর জীবনী বাদ দেয়া হয়েছে বলে গুজবে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাংলা বইয়ের ৯৯ পৃষ্ঠায় ‘হযরত আবু বকর (রা) এর জীবনী’ আলোচনা করা হয়েছে।

চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘হযরত ওমর (রা) এর জীবনী’ বাদ দেয়া হয়েছে বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তবে বাংলা বইয়ের ৯৭ নম্বর পৃষ্ঠায় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর জীবনী তুলে ধরা হয়েছে।

গুজব রটনাকারীরা দাবি করছে, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বই থেকে হযরত মুহম্মদ (সা.) এর বিদায় হজের সংক্ষিপ্ত ভাষণটি বাদ দেয়া হয়েছে। তার বদলে ‘বই’ নামে একটি কবিতা সংযুক্ত করা হয়েছে যেটি কোরআনবিরোধী। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বইয়ের ৯৫ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘বিদায় হজ’ গল্পটি অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পঞ্চম শ্রেণিতে ‘বই’ নামে কোনো কবিতাই নেই।

ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হয়েছে যে, ক্লাস সিক্সের বইয়ে ‘লাল গরু’ নামে একটি গল্প সংযুক্ত করা হয়েছে যেখানে মুসলিমদের বাধ্য করা হচ্ছে গরুকে ‘মা’ বলতে। পাশাপাশি সেখানো হচ্ছে গরু জবাই করা মহা অন্যায়। অথচ ক্লাস সিক্সের বইয়ে ‘লাল গরু’ নামে কোনো গল্পই নেই।

বলা হচ্ছে, ক্লাস সেভেনের বইয়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়ের রচিত ‘লালো’ নামে একটি গল্প রয়েছে যা মুসলমানদের কালীপূজা করতে উৎসাহিত করছে। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টি হচ্ছে সেভেনের বইয়ে ‘লালো’ নামে কোনো গল্পই নেই।

গুজব রটানো হচ্ছে যে, অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে হিন্দুধর্মের রামায়ণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা শিক্ষার্থীদের হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করছে। অথচ অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে রামায়ণ কাহিনীর বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ নেই।

এদিকে, সম্প্রতি ‘সহমত ভাই 0.2’ নামের একটি ফেসবুক পেজে কিছু এডিটেড ছবি শেয়ার করে ‘আমাদের অসাম্প্রদায়িক প্রগতিরা সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইতে যেসকল ইতিহাস তুলে ধরতে ভুলে গেছেন’ শীর্ষক ক্যাপশনে ছবিগুলো ‘পাঠ্যবইয়ে থাকতে পারত’ বলে একটি পোস্ট করা হয়।

পরবর্তীতে ওই ছবিগুলো ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের দাবি করে ফেসবুকে গুজব রটানো হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোর সাথে ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের কোনো মিল নেই।

এছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণির ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ বইয়ে ‘বানর থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে’ বলে আরও একটি গুজব ছড়ানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ‘মানুষ ও সমাজ এলো কোথা থেকে’ শিরোনামের একটি অধ্যায়ে মানুষের আদি ও বর্তমান রূপের বিবর্তনের একটি ছবি দেয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একইসঙ্গে অধ্যায়টিতে মানুষ বানর থেকে সৃষ্টি হয়েছে এমন কোনো কথাই বলা হয়নি।

এসবের পাশাপাশি হিন্দু ধর্মীয় শব্দ-বাক্য-ছবি পাঠ্য বইয়ে যুক্ত হয়েছে বলেও গুজব ছড়ানো হয়েছে। এই গুজবের সঙ্গে ‘গুরুকুল শিশুপাঠ’ নামের একটি বইয়ের ছবি ভাইরাল হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, বইটি বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থার বই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বইটি সরকারের প্রকাশিত কোনো বই নয় বরং এটি সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বীদের শিশুদের জন্য ইসকন প্রকাশিত একটি বইয়ের পৃষ্ঠা।
মূলত, সনাতন ধর্মের শিশুদের ধর্মের পাঠ দেয়ার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে ইসকন বইটি প্রকাশ করে; যার সাথে সরকার বা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো যোগসূত্র নেই।