ঢাকা,  মঙ্গলবার  ১৮ জুন ২০২৪

Gazipur Kotha | গাজীপুর কথা

পণ্য বয়কট অভিযানে কার লাভ আর কার ক্ষতি?

প্রকাশিত: ১৬:২৮, ১১ জুন ২০২৪

পণ্য বয়কট অভিযানে কার লাভ আর কার ক্ষতি?

পণ্য বয়কট অভিযানে কার লাভ আর কার ক্ষতি?

গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর তাণ্ডবে প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনিরা। দফায় দফায় হামলা চালিয়ে তাদের নিরাপদ আশ্রয় কেড়ে নেয়া হচ্ছে। অবরুদ্ধ এই উপত্যকার এমন কোনো স্থান বাকি নেই যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালায়নি। এরই মধ্যেই সেখানে ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে যেসব আন্তর্জাতিক কোম্পানি ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বা সরকারকে সমর্থন করে তাদের পণ্য বয়কটের আহ্বান জানানো হয়। আরব ও ইসলামি বিশ্বে বয়কটের প্রচারণা নতুন কিছু নয়, কারণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই বিষয়টি নিয়ে বহু বছর ধরে অনেক আলোচনা হয়েছে। কখনো কখনো বয়কটের ডাক দেয়ার কারণ রাজনৈতিক, আবার কখনো কখনো ধর্মীয়।

যেমন প্রায় বিশ বছর আগে ইরাকে আমেরিকান আগ্রাসনের সময় আরব দেশগুলোতে আমেরিকান পণ্য বয়কট করা হয়েছিল। গাজা যুদ্ধের আগে সর্বশেষ যে বয়কট প্রচারাভিযান আলোচিত হয়েছে সেটি ছিল সুইডেন ও ডেনমার্কের বিরুদ্ধে।

ওই দেশ দুটি কোরআন পোড়ানোর অনুমতি দিলে আল-আজহারের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এর প্রতিক্রিয়ায় সুইডিশ এবং ডেনিশ পণ্য বয়কটের আহ্বান জানায়। তারা একে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী প্রচারণার অংশ বলে মনে করে।

 

পাকিস্তানে ম্যাক্রোঁ বিরোধী বিক্ষোভেও ফরাসী পণ্য বয়কটের আহ্বান জানানো হয়।

বিভিন্ন বৈশ্বিক কোম্পানি বিশেষ করে যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের পণ্য বয়কটের ডাক দেয়ার মূলে রয়েছে "বয়কট (বর্জন), ডিভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগ প্রত্যাহার) এবং স্যাঙ্কশন (নিষেধাজ্ঞা) প্রচারাভিযান"। যা সংক্ষেপে বিডিএস নামে পরিচিত।

এই প্রচারণা সর্বপ্রথম শুরু হয় ২০০৫ সালে। ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রায় ১৭০টি ফিলিস্তিনি নাগরিক সমাজ সংস্থা এটি চালু করে। অহিংস উপায়ে এই চাপ দেয়া হয় যাতে ইসরায়েল সমস্ত আরব ভূমির দখল বন্ধ করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে। ইসরায়েল যেন ওই ভূখণ্ডে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি-আরবদের সমান অধিকার প্রদান করে এবং তাদের মৌলিক অধিকারকে সম্মান জানায়।

জাতিসংঘের ১৯৪ নম্বর প্রস্তাবনা অনুযায়ী ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকারকে সম্মান ও সুরক্ষা দেয়া উচিত যেন তারা তাদের ভিটাবাড়িতে ফিরে যেতে পারে। ক্যাম্পেইনারদের ওয়েবসাইটে এমনটাই বলা হয়েছে।

এবারো গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে অভিযানে যেসব কোম্পানি ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে তাদের পণ্য বয়কট করার আহ্বান জানিয়ে আসছে বিডিএস।

বিডিএস একইসাথে বিশেষ কিছু কোম্পানির পণ্য বয়কটের আহ্বান জানাচ্ছে, যেগুলো ইসরায়েলের সবচেয়ে সমর্থনকারী বলে মনে করা হয়।

একই সাথে তারা বয়কটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে চিহ্নিত করেছে যাতে প্রচারণার "প্রভাব দ্বিগুণ" হয়। ওইসব কোম্পানির নাম বিডিএস ওয়েবসাইটে তুলে দেয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নির্মিত ইসরায়েলি বসতিগুলোয় এসব কোম্পানির শাখা রয়েছে, সেইসাথে কোম্পানিগুলো ইসরায়েলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগ করে যাতে সেই বসতির পরিধি বাড়ানো যায়।

এসব কোম্পানির মধ্যে একটি বিখ্যাত স্পোর্টস ওয়্যার (খেলাধুলার পোশাক) ও ফুটওয়্যার (জুতা) কোম্পানিও রয়েছে যারা ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে স্পন্সর করে।

 

বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলের শহর তেল আবিবে ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতা বয়কটের আহ্বান জানায়

ওই প্রচারাভিযানে বলা হয়েছে, ওই অ্যাসোসিয়েশনে এমন অনেক ফুটবল দল রয়েছে, যারা আসলে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নির্মিত বসতিগুলোয় তৈরি হয়েছে।

এরকম অনেক অনেক ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যেখানে বয়কটের আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন খাদ্য পণ্য, প্রসাধনী, পোশাক এবং জুতার ব্র্যান্ড, রেস্তোরাঁর চেইন, ক্যাফে এবং সুপারমার্কেট।

সেইসাথে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন জানানোয় সব আমেরিকান পণ্য বয়কটেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

সেইসাথে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির পণ্য বয়কটের ডাকও আসে। কারণ সেসব দেশের নেতারা ইসরায়েল সফর করেছেন এবং গত ৭ই অক্টোবরের ঘটনার প্রেক্ষিতে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন।

এছাড়া অনেক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বয়কট করার আহ্বানও জানানো হয়েছে। ইউজারদের অভিযোগ হল তাদের তৈরি ফিলিস্তিনিপন্থী বিভিন্ন কন্টেন্ট রেস্ট্রিক্ট এবং ডিলিট করে দেয়া হয়।

বর্তমানে এ নিয়ে একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে যেখানে বয়কট করা পণ্যগুলো তালিকাভুক্ত থাকে। যাতে ক্রেতাদের পক্ষে তা শনাক্ত করা সহজ হয়।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের মধ্যে যারা বয়কটকে সমর্থন করে তারা বিভিন্ন বিকল্প পণ্যের তালিকাও প্রচার করছে।

বয়কট কতটা কার্যকর?

বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান এবং মিশরের মতো আরব দেশগুলোতে বসবাসকারী অনেক সাংবাদিক সহকর্মী আমাকে জানিয়েছেন যে, গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা দেখেছে এই বয়কট প্রচারাভিযানের মাধ্যমে চিহ্নিত কিছু রেস্তোরাঁ এবং ক্যাফে চেইনের শাখাগুলোর চাহিদা নাটকীয় হারে কমে গিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের অনেক ব্যবহারকারীরা এ সংক্রান্ত নানা পোস্ট ও ছবি প্রচার করেছে, যেখানে দেখা যায় সুপারমার্কেটগুলো এখন বয়কট প্রচারাভিযানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে বিশাল ছাড় এবং আকর্ষণীয় অফার দিচ্ছে।

 

সুইডেনে কোরআন পোড়ানোর প্রতিবাদে বিভিন্ন ইসলামিক দেশে সুইডিশ পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়ে বিক্ষোভ করেছিল।

একে তারা তাদের প্রচারাভিযানের সাফল্যের প্রমাণ বলে মনে করে। এই প্রচারাভিযানের সমর্থকরা তাদের কার্যকর ভূমিকার প্রমাণ হিসাবে এমন কিছু তথ্য শেয়ার করেছে।

যেখানে বলা হয়, কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা সংঘাতের শুরুতে ইসরায়েলের প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানালেও তারা পরে ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল উভয় দিকে হতাহতের ঘটনায় সেইসাথে ইহুদি-বিদ্বেষ এবং মুসলমানদের ঘৃণার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার জন্য তাদের দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে।

ওই কোম্পানিগুলো রেড ক্রসসহ অন্যান্য সংস্থাকে অনুদান দেয়ার কথা বলেও বিবৃতি দিয়েছে। ওই ত্রাণ সংস্থাগুলো "মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে" ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য করে। তারা বেশ আশা প্রকাশ করে জানায় যে ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল উভয়ের ক্ষেত্রেই শান্তি অর্জিত হবে।