ঢাকা,  মঙ্গলবার  ২৮ মে ২০২৪

Gazipur Kotha | গাজীপুর কথা

শ্বাসসকষ্ট: ফুসফুসের না হার্টের সমস্যা

প্রকাশিত: ১৪:১৫, ১৪ মে ২০২৪

শ্বাসসকষ্ট: ফুসফুসের না হার্টের সমস্যা

ফাইল ছবি

শ্বাসকষ্টের রোগীরা প্রায়ই একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন, উনি কোন ধরনের চিকিৎসকের চিকিৎসা গ্রহণ করবেন, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ না হার্ট স্পেশালিস্ট। সাধারণভাবে চিন্তা করলে এটাই সঠিক মনে হয় যে, শ্বাসকষ্ট যেহেতু ফুসফুসের মাধ্যমে পরিচালিত হয় তাই বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করলেই ভালো হবে। তবে একথা সত্য, সাধারণভাবে যেসব শ্বাসকষ্ট হয় তার বেশির ভাগই হার্টের অসুস্থতার জন্য হয়ে থাকে এবং বাচ্চাদের বেলায় এবং শেষ বয়সে ফুসফুসের সমস্যা বেশি দেখা যায়।

আমরা প্রায় সবাই গরু-ছাগলের ফেপরা বা ফুসফুস দেখেছি এক একটি স্পঞ্জের মতো বস্তু, যার মধ্যে অনেক ফাঁপা অংশ থাকে এর একটি কিন্তু চুপসে যায় না যদি সিদ্ধ বা রান্নাও করা হয় তবুও কিন্তু ফেপরা চুপসে যায় না, এর প্রধান কারণ হলো ফুসফুসে অসংখ্য বায়ুভর্তি ছোট ছোট বেলুনের মতো জায়গা থাকে, এদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এলভিওলি বলা হয়। মানুষ শ্বাসকার্যের মাধ্যমে যখন বাতাস গ্রহণ করে তখন এসব বেলুন স্ফীত হয় বা বড় আকার ধারণ করে মানে, এতে বেশি পরিমাণ বাতাস ভর্তি হয়ে যায়। কিন্তু একইভাবে যখন মানুষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বা বাতাস বের করে দেয় তখন বেলুনগুলো থেকে বাতাস বেরিয়ে যায়। ফলে বেলুনের আকার ছোট হয়ে যায়। এলভিওলিগুলোতে বাতাস ঢোকা এবং বের হওয়ার জন্য একটি নালি থাকে যার মাধ্যমে প্রতিবার নিঃশ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সময় বাতাস আসা যাওয়া করে এই বায়ু নালিগুলো একটি আর একটির সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হতে হতে এক সময় একটি বড় শ্বাসনালিতে পরিণত হয়, যাকে আমরা গলার সামনের অংশে শ্বাসনালি হিসাবে চিনে থাকি। এলভিওলিগুলোর বাইরের দিকে এবং এর দেয়ালে প্রচুর পরিমাণ রক্তনালি বিদ্যামান থাকে এতবেশি  রক্তনালি দ্বারা এলভিওলি আরও থেকে থাকে আমরা বলতে পারি যে, এলভিওলি রক্তের সাগরে ডুবে আছে। এইসব এলভিওলির মাধ্যমে রক্ত থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য দূষিত গ্যাস বেলুনের (এলভিওলির) বাতাসে প্রবেশ করে শরীর থেকে দূষিত গ্যাস শ্বাসকার্যের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। 

অপর দিকে বেলুনের বাতাসে থাকা অক্সিজেন রক্তে মিশে শরীরের জন্য প্রয়োজনিয় অক্সিজেন বাতাস থেকে রক্তের মাধ্যমে শ্বাস শরীরে সরবরাহ হয়ে থাকে মানব দেহে ও অন্যান্য প্রাণির দেহে রক্ত কিন্তু সদাসর্বদাই চলমান থাকে এবং একটি হার্ট দ্বারা প্রতিনিয়ত রক্ত পাম্পের মাধ্যমে করে থাকে, মজার ব্যাপার হলো যেহেতু ফুসফুস একটি আবদ্ধিজায়গার মধ্যে বাতাস থাকে এবং রক্তের সাগর থাকে তাই প্রায়ই ফুসফুসের জায়গা দখলের জন্য রক্ত এবং বাতাসের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হয়। শ্বাসকার্য সঠিকভাবে সম্পাদন করার জন্য ফুসফুসে রক্ত এবং বাতাস একটা অনুপাত রক্ষা করে চলে। যদি কোনো কারণে এই অনুপাত নষ্ট হয়ে যায় মানে যদি বাতাস বেশি এবং রক্ত কমে যায় অথবা রক্ত বেশি এবং বাতাস কমে যায় তবে শ্বাসকার্য ব্যাহত হবে এবং ব্যক্তি শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হবে। ফুসফুসে বাতাস কিন্তু একই নালি দিয়ে আশা যাওয়া করে থাকে অপর দিকে রক্ত এর পাশদিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং অন্য পাশ দিয়ে ফুসফুস থেকে বেড় হয়ে যায়। এখানে হার্টের ডানপাশ সারা শরীর থেকে দূষিত রক্ত সংগ্রহ করে পরিশোধনের জন্য ফুসফুসে প্রেরণ করে এবং ফুসফুসে পরিশোধিত রক্ত হার্টের বামপাশের মাধ্যমে সারা শরীরে সরবরাহ করে থাকে। ফুসফুসের যেসব সমস্যার জন্য শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফুসফুসে বায়ুনালি চেপে যাওয়া। যার ফলে ফুসফুসে বায়ু চলাচল ব্যাহত হয়, যাকে আমরা সাধারণভাবে অ্যাজমা বলে থাকি। যা অনেক সময়ই বংশগত প্রবণতা থেকে হয়ে থাকে। ব্যক্তি প্রায় সময়ই ছোটবেলা থেকেই এ ধরনের শ্বাসকষ্টে ভুগে থাকেন। এলার্জির কারণে বা জীবাণু সংক্রমণের জন্য অ্যাজমার শ্বাসকষ্ট মাঝে মাঝে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। সালবিউটামল বা অনুরূপ অন্যান্য ওষুধ মুখে খেলে বা ইনহেলারের মাধ্যমে গ্রহণ করলে বায়ুনালি প্রসারিত হয়ে শ্বাসকষ্ট কমে যায়। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও সিওপিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস ও বায়ুনালিতে প্রদাহ হওয়ার জন্য ফুসফুসে বায়ু চলাচল ব্যাহত হয়ে, শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়ে থাকে এক্ষেত্রেও জীবাণুর সংক্রমণ অসুস্থতার মাত্রা বৃদ্ধি করে শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে এ ক্ষেত্রে এন্ট্রিবায়োটিক এবং সালবিউটামল জাতীয় ওষুধ বেশ কার্যকরী। অনেক সময় ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণের জন্য এলভিওলিতে পুঁজ জাতীয় জমা হয়ে এলভিওলি ভর্তি হয়ে যায় এবং বাতাস প্রবেশ করতে না পারায় কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। জীবাণু সংক্রমণের জন্য কাশি ও জ¦র হয়ে থাকে এবং ফুসফুসের গ্যাস অদল বদল হতে না পারায় শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, এই অসুস্থতাকে নিউমোনিয়া বলা হয়। শিশু ও বয়ঃবৃদ্ধ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে।

উপরে উল্লেখিত অসুস্থতাগুলো যেহেতু জীবাণু সংক্রমণের মাধ্যমে ঘটে থাকে তাই কাশি এবং জ¦র প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিদ্যমান থাকে। হার্টে যেহেতু তার মাংসপেশি সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে রক্ত পাম্প করে শরীরের প্রতিটি কোনায় কোনায় রক্ত প্রবাহ (সরবরাহ) নিশ্চিত করে, তাই হার্টের যে কোনো ধরনের অসুস্থতা রক্ত সরবরাহের সমস্যা দেখা দেয়। হার্টে ভাল্বের সমস্যা হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফুসফুসে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়ায় শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় আর কোনো ক্ষেত্রে ফুসফুসে অধিক রক্ত সরবরাহের ফলে ফুসফুসের বায়ুপ্রবাহ কমে গিয়ে শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়ে থাকে। পূর্বে আলোচনা করেছি, রক্ত এবং বাতাসের মধ্যে সব সময় একটা প্রতিযোগিতা  লক্ষ্য করা যায়। ছোট বাচ্চাদের বেলায় যাদের হার্টে জন্মগত সমস্যা থাকে তাদেরও ফুসফুসে রক্ত সরবরাহ কখনো প্রয়োজনের চেয়ে কম এবং কখনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হওয়ায় দুই ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে থাকে। যেসব ব্যক্তির হার্ট দুর্বল হতে হতে এমন এক মারাত্মক পর্যায়ে উপনীত হয় যে, হার্ট প্রয়োজনীয় পরিমাণ রক্ত পাম্প করতে অপারগ হয়ে পড়ে ফলশ্রুতিতে হার্ট পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত পাম্পের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রেরণ করতে না পারায় ফুসফুসে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। যার ফলে সারা শরীরে অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দেয় এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড জমা হতে থাকে। এ অবস্থায়ও রোগী সারাক্ষণ শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকে। যারা উচ্চ রক্তচাপ বা হাই প্রেসারে ভুগছেন তাদের হার্ট বামপাশে ঠিকমতো কাজ না করতে পারায় ফুসফুস থেকে রক্ত অল্প মাত্রায় বেড় হয়ে হার্টে বামপাশে প্রবেশ করায় ফুসফুসে অধিক পরিমাণে রক্ত জমা হতে থাকে ফলশ্রæতিতে ব্যক্তি শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রোগ ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ বা হার্টের রক্তনালিতে ব্লক হওয়ার ফলে হার্টের পাম্পিং পাওয়ার কমে যায় বিশেষ করে বামপাশে এবং প্রায় ক্ষেত্রেই হার্টের ডান পাশের পাম্পিং পাওয়ার ঠিক থাকে। এই কারণে ফুসফুসে রক্ত প্রবেশ ঠিক থাকে কিন্তু বামপাশে কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় রক্ত অধিক পরিমাণে জমা হয়ে শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে প্রায়ই তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। হার্ট ব্লকের রোগীরা যখন বিশ্রামে থাকেন, তখন সাধারণত শ্বাসকষ্ট থাকে না কিন্তু রোগী যখনই কোনো কাজ যেমন হাঁটাহাঁটি সিঁড়িতে উপরে ওঠা ও শক্তি প্রয়োগের কোনো কাজ করতে যান তখনই শরীরে অক্সিজেনের প্রয়োজন বেশি হয় এবং রোগী বুকব্যথা, বুকচেপে আসা, শরীরে ঘাম সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন এবং রোগী বিশ্রাম গ্রহণ করলে শরীরে অক্সিজেন চাহিদা কমে যায় এবং তার সঙ্গে শারীরিক অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্ট কষ্ট ও দূরীভূত হয়ে যায়। 

পরিশেষে এটা বলা যায়, ফুসফুসজনিত কারণে বাচ্চা এবং বয়ঃবৃদ্ধ ব্যক্তিরা বেশির ভাগ সময় শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন এর সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সময়ই জ্বর-কাশি বিদ্যমান থাকে। হার্টজনিত কারণে সাধারণত মাঝবয়সী ব্যক্তি ও প্রবীণরা শ্বাসকষ্টে বেশি আক্রান্ত হন এবং তাদের জ্বর থাকে না খুব বেশি, কাশিতেও আক্রান্ত হতে দেখা যায় না কারও কারও শুকনা কাশি থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই হার্টজনিত শ্বসকষ্ট পরিশ্রমকালীন সময় দেখা দেয় এবং বিশ্রাম গ্রহণে নিবারণ হয়ে যায়। তাই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

সংগৃহিত