ব্রেকিং:
"গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ।" "বিশিষ্ট সাংবাদিক, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরী আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের শোক।"
  • বৃহস্পতিবার   ১৯ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৯

  • || ১৮ শাওয়াল ১৪৪৩

গাজীপুর কথা

নীতি নির্ধারণ নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে নীরব দ্বন্দ্ব

গাজীপুর কথা

প্রকাশিত: ৯ মে ২০২২  

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের নীতি নির্ধারণ নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ের রোডম্যাপ, আন্দোলন ও কর্মসূচির ধরন এবং ‘নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠনের’ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ— জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মাঝে শীতল বিরোধিতা চলছে। তবে সিদ্ধান্তগুলো যেহেতু দলের শীর্ষপর্যায় থেকে এসেছে, সে কারণে দ্বন্দ্বগুলো অনেকটাই নীরবে প্রবাহমান।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৯ মার্চ লন্ডনে ‘নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই ঘোষণায় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য, বিশেষভাবে সিনিয়র চার জন সদস্য বিস্মিত হন। যার রেশ মেলে কমিটির পরের বৈঠকে। সেই বৈঠকে স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য জিজ্ঞাসা করেন, ‘জাতীয় সরকার বিষয়টা কী তা তো বুঝতেছি না।’

বিষয়টি নিয়ে স্থায়ী কমিটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের কথা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলাপকালে বেরিয়ে এসেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকারের প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পর দলের অভ্যন্তরেই প্রশ্ন ওঠে। কেউ কেউ অবাক হন, বিষয়টি নিয়ে আগে থেকে কোনও আলোচনা না হওয়ায়। বিশেষত, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব থাকায়, তাদের সঙ্গে পূর্বালোচনা না হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে বিএনপির প্রস্তাব কতটা ফলাফল বয়ে আনবে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

জানা গেছে, জাতীয় সরকারের ঘোষণার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির চার জন সদস্য, এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একজন দায়িত্বশীলও রয়েছেন— তারা বিষয়টিকে সহজভাবে নেননি। বিশেষত, লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যখন এর ঘোষণা দেন, তখন ওই সময় স্থায়ী কমিটির একজন ও গুরুত্বপূর্ণ আরেকজন নেতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের বিশেষ উৎসাহেই নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এমন বড় ঘোষণা এসেছে— এমনটি ধরে নিয়ে সিনিয়র একাধিক সদস্য বিষয়টিকে সহজভাবে নেননি।

দলের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা জানান, জাতীয় সরকারের পলিসি নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে কোনও আলোচনা হয়নি এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক রোডম্যাপ নিয়েও স্থায়ী কমিটির সিনিয়র বেশ কয়েকজন সদস্য অন্ধকারে রয়েছেন। প্রসঙ্গত, গত কয়েকমাস ধরেই লন্ডন থেকে সরাসরি নির্দেশনায় দলের বিভিন্ন নীতি নির্ধারণ নিয়ে কাজ করছেন কয়েকজন নেতা।

একজন দায়িত্বশীল নেতা মনে করেন, ‘বিএনপির মূল সমস্যা আস্থাহীনতায়। এক-এগারোর পর থেকে দলে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এটি দূর হলেই রাজনৈতিক সমস্যা অনেকটা কেটে যাবে। অনাস্থার জায়গা থেকে রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। বড় দুই দলই কাউকে আস্থায় রাখছে না। প্রতিহিংসা বেড়েছে। দুই দলকেই এই অবস্থা থেকে বেরুতে হবে।’

স্থায়ী আরেক সদস্যের মন্তব্য, ‘দলের নেতাদের কে কোথায় নিজেদের সরিয়ে রেখেছেন সেই নিশ্চয়তা নেই। সেজন্যই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছেন।’

যদিও স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেওয়ায় নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়টি চাপা পড়ে। রাজনৈতিকভাবে যা গুরুত্বপূর্ণ।’

স্থায়ী কমিটির প্রবীণ একজন সদস্য স্বীকার করেন, জাতীয় সরকার পলিসি নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে কোনও আলোচনা হয়নি। এমনকী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও আলোচনা হয়নি। যদিও স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য দাবি করেন, ম্যাডামের কনসার্ন ছাড়া বিএনপি চলছে না। জাতীয় সরকারের পলিসি নিয়েও বিএনপির চেয়ারপারসনের সঙ্গে কথা বলেছেন তারেক রহমান।

রবিবার (৮ মে) বিকালে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘বিএনপিতে কোনও বিতর্ক নেই।’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘যখন আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রতি সপ্তাহে স্থায়ী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেন, বৈঠক করেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই সবার মন বুঝেই এটি ঘোষণা করেছেন।’

বিএনপির পক্ষ থেকে গত কয়েকমাস ধরে অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করার সিদ্ধান্ত আছে। যদিও পর্দার আড়ালে প্রায় সবগুলো দলের সঙ্গেই আলোচনা সেরে নিয়েছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এসব দলের একাধিক প্রধান নেতা ‘নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠনের’ প্রস্তাবটিকে টোপ হিসেবে দেখছেন।

যদিও ওই দলগুলোর একটির সভাপতি বলেন, আমি তো প্রথমে এটাকে টোপ হিসেবে দেখেছিলাম। কিন্তু পরে আলোচনার পর বুঝতে পেরেছি যে, বিএনপির পক্ষ থেকে যেভাবে নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে, তার কারণ হচ্ছে ‘শুধু আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে কী করবে, সেটা তো বিএনপি স্পষ্ট করছে না। তো আমি সেসব শুনে বললাম, এটা তো খারাপ না। বলার সময় কেন ব্যাখ্যা করা হয়নি। প্রেজেন্টেশনের কারণে আমি সেভাবে উল্লেখ করেছিলাম।

স্থায়ী কমিটির নেতা মির্জা আব্বাস বলেন, ‘বিএনপি সবসময় সরল রাজনীতি করেছে। কাউকে ফাঁদে ফেলার রাজনীতি বিএনপি করে না। জিয়াউর রহমান করেননি, বেগম খালেদা জিয়া করেননি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও করেন না। বিএনপির নীতির মধ্যে এটা নাই। বিএনপি এখন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। এটা গোপন কিছু নয়। নির্বাচনে যদি জিতে আসে তাহলে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে, এটা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেছেন। টোপ ফেলার কিছু নাই।’

বিএনপির বিভিন্ন দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনের আগে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা সম্ভব কিনা সেই প্রশ্ন রয়েছে দলে। ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও কর্মসূচি দেওয়া সম্ভব কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে সিনিয়র নেতাদেরও।

স্থায়ী কমিটির কোনও কোনও সদস্য মনে করেন, নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে চরমপন্থা অবলম্বন করা হলে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত এই সরকারের অধীনেই নির্বাচন থেকে বিরত থাকবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। আরও কিছু পরিস্থিতির ওপর এটি নির্ভর করছে। এরমধ্যে রয়েছে অন্যান্য বিরোধী দল কী মনে করছে, তাদের অবস্থা কী হতে পারে, শেষ পর্যন্ত কারা সরকারের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ইত্যাদি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমমনা একটি দলের সভাপতি বলেন, ‘বিএনপির মধ্যে শৃঙ্খলা নেই। বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে অনেক নেতা ধরাশায়ী। দলের অনেক ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছে না। স্থায়ী কমিটিও কিছু বলতে পারছে না। নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ উঠে যাচ্ছে। এখন তো তৃণমূলেও অনেকে নেতার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। দলের পদক্ষেপ নেই। তারা আলোচনা করবো-করবো করে আমাদের কর্মসূচি থেকে বিরত রাখছে।’

যদিও বিএনপির প্রভাবশালী একজন নেতা বলেন, ‘দলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এখন যেকোনও নেতা সমস্যা সৃষ্টি করলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। দল সুসংগঠিত আছে।’

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আগামী নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু করা যায় সেটা ভাবছি আমরা।’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বিএনপি আন্দোলনে আছে। আন্দোলন করছে। এখন সারা দেশের মানুষকে একত্রিত করে সমন্বিত আন্দোলনে যেতে চাই আমরা। সেই প্রক্রিয়া চলছে। ইতিহাসে দেখা যায়, আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটু সময় লাগে, কিন্তু চূড়ান্ত ফল আসে। আমরা মনে করি, এবারের আন্দোলনে ফল আসবে। কারণ মানুষ বর্তমান সরকারকে নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।’

জাতীয় সরকারের বিতর্ক প্রসঙ্গে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীর উত্তর, ‘আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচনের পর জাতীয় সরকারের ঘোষণা দিয়েছেন। বিএনপি সবচেয়ে বড় দল। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলে বিএনপি কী চায় জনগণের কাছেসেই মানচিত্র থাকা দরকার। অনেকেই বলেছেন, বিএনপি কী চায় বলে না। এখন বিএনপি বলেছে, এখন তারা বলেছে টোপ ফেলেছি। আমরা টোপ ফেলিনি। দেশ গঠনে জাতীয় ঐক্য লাগবে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সরকার গঠন করে এই দেশ গঠন করতে হবে।’

গাজীপুর কথা
গাজীপুর কথা