বৃহস্পতিবার  ১১ আগস্ট ২০২২,   শ্রাবণ ২৬ ১৪২৯,  ১৩ মুহররম ১৪৪৪

Gazipur Kotha | গাজীপুর কথা

গাজীপুরে মরুভূমির ফল খেজুর চাষ সফল বাদল

প্রকাশিত: ২১:৪১, ৫ আগস্ট ২০২২

গাজীপুরে মরুভূমির ফল খেজুর চাষ সফল বাদল

নজরুল ইসলাম বাদল

চাষি নজরুল ইসলাম বাদল। গাজীপুরের সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের আলিমপাড়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহমান খানের ছেলে। ২০০৩ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে পাশ করেছেন। সেখান থেকে পাশ করার পর বেকারত্ব ঘুচাতে তিনি এনজিওসহ কয়েকটি টেলিকমিউনিকেশন সংস্থায় পরিবেশকের চাকরি করেন ২০১৫ সাল পর্যন্ত।

কিন্তু পরে তিনি সব বাদ দিয়ে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে যোগ দেন। কৃষিকাজে নতুন সম্ভাবনার দিক খুঁজতে থাকেন বাদল। বর্তমানে তার কৃষি জীবনে ভরে উঠেছে সাফল্যগাথায়। শিক্ষাজীবনে গণিতের চর্চা করে ব্যক্তি জীবনে তা প্রয়োগে সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন বাদল। 

দেশ-বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজদের জমিতে ‘সৌদি ডেট পাম ট্রিস ইন বাংলাদেশ’ নামে ব্যক্তি উদ্যোগে খেজুরের বাগান গড়ে তুলেন। খেজুর গাছ চাষের পাশাপাশি খেজুর চারার নার্সারিও গড়ে তুলেছেন ওই চাষি।

গাজীপুরে মরুভূমির ফল খেজুর চাষ করে দেশে খেজুরের চাহিদা মেটানোর স্বপ্ন দেখছেন নজরুল ইসলাম বাদল (৩০)। খেজুর আবাদের সফলতায় দেশের বিভিন্ন জেলার আগ্রহী চাষিরাও তার কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে খেজুর চাষে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে সম্মান ডিগ্রি অর্জনের পর কৃষক পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহমানের সঙ্গে কৃষিকাজে মনোযোগ দেন। তখন থেকেই কৃষিতে নতুন কিছু করার চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। সেই ভাবনা তাকে নিয়ে যায় সৌদি আরব প্রবাসী এক বন্ধুর কাছে।

২০১৫ সালে শুরুর দিকে ওই বন্ধুর সহযোগিতায় খেজুরের চাষ ও নার্সারি করার পরিকল্পনা করেন। মরুভূমি অঞ্চলের ফসল বাংলাদেশের কাদামাটির ফলানো সম্ভব কিনা তা নিয়েও তার ভাবনার অন্ত ছিল না। তারপরও প্রবাসী ওই বন্ধুর সহযোগিতায় বিশ্বের ৬টি দেশ থেকে বিভিন্ন জাতের খেজুরের বীজ ও চারা সংগ্রহ করেন বাদল। ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথমে ১৮টি চারা রোপণ করে মরুর খেজুরের চাষ শুরু করেন। এর জন্য প্রথমেই তার খরচ হয়েছে ৫২ লাখ টাকা।

প্রথমে ৭০ শতক জমিতে সৌদি আরবের খেজুরের জাত নিয়ে বাগান শুরু করেন। ২০১৭ সালে প্রথম তার বাগানের খেজুর গাছে ফলন আসতে শুরু করে। খেজুরের বীজ কিংবা সাকার থেকে চারা উৎপাদন করে খেজুরের নার্সারিও গড়ে তোলেন। সেই বছরেই বাগান থেকে ৬২ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেন।

এরপর তাকে আর পেছনে ফিরতে হয়নি। বর্তমানে তার বাগানে ও নার্সারিতে ১৬ প্রজাতির খেজুর গাছ রয়েছে। তারপরও মানুষের ব্যাপক চাহিদার যোগান দিতে তিনি আরও ১৪ জাতের চারা বাইরে থেকে এনেছেন। বর্তমানে নার্সারিসহ তার খেজুর বাগানটি সাড়ে ৭ বিঘায় সম্প্রসারিত করেছেন।

সাকার থেকে উৎপাদিত চারায় ফলনের হার বেশি। সাকারের চারা রোপণের এক/দুই বছরের মধ্যেই খেজুর ধরে। এ ধরনের প্রতিটি সাকারের দাম ২৫ হাজার টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর খেজুর ধরা অবস্থায়ও চারা বিক্রি করা হয়, যার দাম হলো ৩ লাখ টাকা। বাগান পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতি মাসে তার ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়।

খেজুর চাষি নজরুল ইসলাম বাদল জানান, পরীক্ষামূলকভাবে তিনি শুরুতে বিভিন্ন জাতের ১৮টি গাছ রোপণ করেছিলেন। ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথমে ১৮টি চারা রোপণ করে মরুর খেজুরের চাষ শুরু করেন। এ বছরও বাগানের গাছগুলোতে অনেক খেজুর ধরেছে। একেকটি খেজুরের বাধার ওজন প্রায় ২৫ কেজি। তার এ সফলতা খেজুর চাষে আগ্রহীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। নতুনভাবে খেজুর চাষে আগ্রহীদের মধ্যে তার এ সফলতা প্রেরণা জুগিয়েছে।

তিনি জানান, তিনি ৩০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খেজুরের নার্সারি গড়ে তুলেছেন। তার সংগ্রহে খেজুরের যেসব জাত রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আজওয়া, মরিয়ম, আম্বার, খুনিজি, হেলালি, ম্যাডজেলি, বারহি, খালাস, ওমানি, সুক্কারি, সাফাওয়ি ইত্যাদি। যেভাবে ফলন হচ্ছে তা ঠিক থাকলে অচিরেই তিনি দেশে খেজুরের চাহিদা মেটাতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করছেন তিনি।

টিসু, কলম (সাকার) ও সরাসরি বীজ থেকে উৎপাদিত হয় চারা। টিস্যু ও কলম চারা থেকে ১-২ বছরে ফলন পাওয়া যায়। একটি টিস্যু চারা ৮ থেকে ১০ হাজার, কলম চারা ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং বীজের চারা ৮শ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে।

একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছে ৮-১২টি বাধি ধরে। প্রতি বাধিতে ২৫ থেকে ৩০ কেজি করে খেজুর হয়। তাছাড়া বীজ থেকে উৎপাদিত চারায় ফলন আসতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ বছর। বীজ থেকে উৎপাদিত চারার দাম তুলানমূলক কম। এখানে চারা ছাড়াও খেজুরও বিক্রি করা হয়।

দেশে বছরে প্রায় ৩০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। যার পুরোটাই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। দেশে খেজুর বাগান করতে সরকারের কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে আগামী ১০ বছরের দেশে উৎপাদিত খেজুরই দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে জানান বাদল।

বাদল আরও বলেন, এক্ষেত্রে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ দিতে পারলে দেশে খেজুর চাষে হাজারো চাষি তৈরি হবে। কৃষকের মধ্যে খেজুর চারা সহজলভ্য ও কম মূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ হতে পারে খেজুর উৎপাদনের সম্ভাবনাময় দেশ।

ময়মনসিংহের ভালুকার পাঁচগাঁও এলাকার মাদ্রাসা শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন জানান, ২০১৯ সালে তিনি গাজীপুরের নজরুল ইসলাম বাদলের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বারহী জাতের একটি এবং ৫০ হাজার টাকায় মরিয়ম জাতের একটি খেজুর গাছের সাকার কলমের চারা ক্রয় করেন। বাদল ভাই নিজে এসে চারা দুটি তার জমিতে রোপণ করে দিয়ে গেছেন। ২০২২ সালের  ফেব্রুয়ারিতে খেজুর গাছে ফুল আসে, মার্চেই তা ফলে পরিণত হয়। তাদের মধ্যে মরিয়মের জাতটি বারোমাসি হয়েছে। 

তিনি বাদলের কাছ থেকে আবারো ৭৫ হাজার টাকায় একটি হেলালী, একটি আম্বার ও একটি খুদরি জাতের সাকারের কলম চারা ক্রয় করেছেন। চারাগুলো বাদল ভাই নিজে এসে আমার বাগানে লাগিয়ে দেবেন।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকার হাজী মমতাজ উদ্দিন জানান, তিনিও বাদলের কাছ থেকে চারা কিনেছেন। তাতে ভালো ফলন হচ্ছে। ২০২০ সালে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি দুইটি খেজুর চারা ক্রয় করেছিলেন। ২১ মাস পরে এসব গাছে ফুল ও ফলন আসে। এখন প্রতিটি গাছে চারটি বাধির খেজুরগুলো পরিপক্ব হয়েছে।

গাজীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি প্রায় ৬ মাস হয় গাজীপুরে যোগদান করেছি। তারপরও খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামে প্রায় তিন বিঘা জমিতে সফলভাবে সৌদির খেজুর চাষ করছেন বাদল নামের এক যুবক। বাংলাদেশে সৌদি আরবের খেজুর চাষ একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। এর জন্য কৃষিপর্যায়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।