ঢাকা,  সোমবার  ২২ জুলাই ২০২৪

Gazipur Kotha | গাজীপুর কথা

বারোমাসি লেবু চাষে সোহানের বাজিমাত

প্রকাশিত: ২৩:২১, ১৭ জুন ২০২৪

বারোমাসি লেবু চাষে সোহানের বাজিমাত

সংগৃহিত ছবি

২০১৭ সালে স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শে মাত্র তিনটি জাতের ২০টি বারোমাসী লেবু চারা নিয়ে মাত্র ৫ শতক জমিতে লেবু চাষ শুরু করেন ২৭ বছর বয়সী মো. সোহান। এখন তার বাগানে আছে নয়টি জাতের ৫০টিরও বেশি বারোমাসি লেবু গাছ। অসময়ে লেবুর পাশাপাশি গাছের চারা বিক্রি করে আশপাশের বেকার যুবক ও প্রতিবেশীদের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন তিনি।

সোহান গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের চুয়ারিয়াখোলা গ্রামের মো. মোনাব্বরের ছেলে। পেশায় তিনি একজন ইলেকট্রিশিয়ান। ছোটবেলা থেকেই প্রতিবেশী এক মামার সঙ্গ নিয়ে ইলেকট্রিকের কাজ তিনি রপ্ত করেছেন। এখন সে পুরোদমে একজন ইলেকট্রিশিয়ান। তবে কৃষি কাজ তার শখের জায়গা।

সোহানের লেবু চাষ দেখে প্রতিবেশীদের অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে লেবু বাগান গড়ে তুলেছেন। তারাও লেবুর চাষাবাদ করে ভালো আছেন। বর্তমানে ওই এলাকা ‘লেবুর এলাকা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

জানা গেছে, কলম্বো, কাগজি, হাইব্রিড কাগজি, গোল কাগজি, সিডলেস, চায়না থ্রি, গন্ধরাজ, জারা ও এলাচি জাতের বারমাসী লেবু চাষে বাজিমাত করেছেন সোহান। প্রতিদিন পাইকাররা তার বাগান থেকে বিভিন্ন জাতের লেবু কিনে নিয়ে যান। এ লেবু গাজীপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। এছাড়া মাঝেমধ্যে তার বাগানের লেবু মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও যায়। এ লেবু ক্রয় বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িতরাও মাসে ভালো টাকা আয় করছেন।

সোহান বলেন, আমি যার কাছে ইলেকট্রিক কাজ শিখতাম, তার ৮৫০ টাকা মজুরী বাকী ছিল। তিনিও কাজের পাশাপাশি বারোমাসি বিভিন্ন জাতের লেবু চাষ করতেন। আমার কাজের মজুরী দিতে দেরি হওয়ায় আমি পাওনা টাকার পরিবর্তে লেবু গাছের চারা দিতে বলি। তিনি আমাকে তিনটি জাতের ২০টি লেবু চারা দেন। সেটা ২০১৭ সালের কথা। পরে আমি স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শে তিনটি জাতের ২০টি বারোমাসি লেবু চারা নিয়ে পাঁচ শতক জমিতে চাষ শুরু করি। এখন আমার বাগানে আছে নয়টি জাতের ৫০টিরও বেশি বারোমাসি লেবু গাছ। আমি অসময়ে লেবু ও লেবু গাছের চারা বিক্রি করে আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভাল আছি। আমার বাড়ির ও গ্রামের আশপাশের প্রতিবেশী ও বেকার যুবকরাও আমার কাছ থেকে চারা ও পরামর্শ নিয়ে লেবু চাষ শুরু করেছে।

তিনি আরো বলেন, ফাল্গুন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে এ লেবুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। তখন প্রতিটি লেবু ৭ থেকে ১০ টাকা দরে বিক্রি করি। ওই তিন মাসে আমার বাগানের লেবু বিক্রি করে ভালো টাকা আয় হয়। তাছাড়া অফ সিজনে এক হালি লেবু ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি লেবু কাটিং বিক্রি করেও ভালো আয় হয়।

এ লেবু চাষি বলেন, বাগানে এসে পাইকাররা নগদ টাকায় লেবু কিনে নিয়ে যায়। তারা এ লেবু স্থানীয় বাজার, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন। আমার বাগানের লেবুর ফ্লেভার ভালো। কিছু কিছু লেবুর কোনো বীচি নেই, রসও প্রচুর। লেবু সালাদ ও শরবতে বেশি ব্যবহৃত হয়। এ কারণে বাজারে আমার লেবুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। লেবুর বাগান করে আমি লাভবান হয়েছি।

দক্ষিণ রাজনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিজানুর রহমান মোড়ল (৬০) বলেন, সোহান যে বারোমাসি লেবু চাষ করে সেটা অফ সিজনে প্রচুর দাম থাকে। এছাড়া সিজনেও ভালো বিক্রি হয়। এ লেবুতে প্রচুর ঘ্রাণ ও রস আছে। তার এ লেবু চাষ দেখে আশপাশের বেকার যুবকরাও এগিয়ে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

সৌদি প্রবাসী শাহিন মিয়া (২৬) বলেন, আমি সাড়ে চার বছর সৌদি আবরে ছিলাম। এখন দেশে ফিরে এসেছি আর যাব না। সোহান ভাইয়ের লেবু বাগানের কথা শুনে দেখতে আসলাম। আমিও একটি লেবু বাগান করতে আগ্রহী। সোহান ভাইয়ের কাছ থেকে তিন জাতের কিছু লেবু চারা নিয়ে এক একর জমিতে চাষ শুরু করবো। লেবু বাগান করতে চারা ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবেন বলে তিনি আমাকে কথা দিয়েছেন। 

প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন (৪৬) বলেন, সোহান একজন সফল কৃষক। সে ৮-১০ জাতের লেবু চাষ করে। প্রবাসীরা দেশ থেকে যাওয়ার সময় অনেকে সোহানের কাছ থেকে লেবু কিনে নিয়ে যান। এছাড়া স্থানীয় পাইকাররা তার বাড়ি থেকে সরাসরি নিয়ে যান।  

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফারজানা তাসলিম বলেন, সোহান একজন সফল কৃষক। তিনি আমাদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় লেবু বাগান করেছেন। তিনি আট বছর আগে তিন জাতের বারোমাসি লেবু চাষ শুরু করেন। আমরা তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি। এখন তার লেবু বাগান থেকে প্রচুর আয় হচ্ছে। তার দেখাদেখি অনেকেই লাভজনক বারোমাসী লেবু চাষে ঝুঁকছেন।