• সোমবার   ২৪ জানুয়ারি ২০২২ ||

  • মাঘ ১১ ১৪২৮

  • || ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

গাজীপুর কথা

শ্রীপুরে একই পরিবারে ৮ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী

গাজীপুর কথা

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০২২  

১০ বছরের শিশু জোনাকি। নামটা জোনাকি হলেও জন্মের পর থেকেই নিজেই কখনো দেখতে পাননি জোনাকির আলো। অর্থাৎ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সে। তারপরও তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। হুজুরের মুখে শুনে শুনে কোরআন পড়া শিখেছে সে।

গাজীপুর শ্রীপুর পৌর এলাকার উজিলাব হলাডিরচালা এলাকার জাকির হোসেনের (২৩) মেয়ে জোনাকি। তার বাবাও চোখে খুব কম দেখেন। এছাড়া জাকিরের বড় ভাই আমির হোসেন (৪০), বোন হাসিনা (৩০) এবং নাসরিনও (২৫) চোখে দেখেন না। আমিরের স্ত্রী শিউলী আক্তারও একচোখে একেবারেই দেখতে পান না, তবে অপর চোখে কিছুটা দেখতে পান। হাসিনার দেড় বছরের ছেলে মারুফ এবং মেয়ে রূপাও (১৩) জন্মান্ধ।

জাকিরের মা রাশিদা বলেন, তার স্বামী হোসেন আলীরও মধ্য বয়সে কি এক জ্বর হওয়ার পর এক চোখ অন্ধ হয়ে যায়। স্বামী জীবিত থাকতে তার সীমিত উপার্জনে কোনোমতে পরিবারের সদস্যদের দুমোঠো অন্ন জুটলেও তিনি মারা যাওয়ার পর অন্ধ সন্তানদের নিয়ে রাশিদা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

স্বামীর নির্মাণ করা একটি দুই কক্ষের টিনশেড ও এক কক্ষের একটি মাটির ঘর থাকলেও মাটির ঘরটির অবস্থা জরাজীর্ণ। টিনের চাল-জানালা ভাঙ্গা। বৃষ্টি-কুয়াশা হলে চাল গড়িয়ে তা ভেতরে পড়ে। অতিকষ্টে বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় মেয়ে হাসিনাও নাসরিনের বাড়ির অদূরেই বিয়ে দিলে তারা শশুরবাড়িতে থাকে। তবে আমির, জাকির ও তাদের স্ত্রী এবং সন্তানদের ভরন পোষণ করতে হচ্ছে রাশিদাকেই।

বিভিন্ন বাড়িতে কাজ-কর্ম করে যা পান তা দিয়ে কোন মতে খাবারের ব্যবস্থা হলেও তাদের উন্নত চিকিৎসা দেয়ার টাকা তার কাছে নেই। তিন মাস পর পর সমাজসেবা থেকে যৎসামন্য সরকারি সাহায্য যা পান তা তাদের এক সপ্তাহও চলে না। আমির হাট-বাজারে পথে পথে ঢোল বাজিয়ে ও গান গেয়ে কিছু অর্থ উপার্জন করলেও করোনা মহামারির শুরুর পর থেকে সে-ও বেকার। এতো কষ্ট, অভাব-অনটনের মধ্যে তিনি কি রেখে কি করবেন বুঝে ওঠতে পারেছেন না। চিন্তায় তারও দু চোখ যেন ঝাপসা হয়ে আসছে।

অন্যের সাহায্য নিয়েই সংসারের হাল ধরে রাখার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এমতাবস্থায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সংসারের অনটন দূর করতে এবং স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।

আমির জানান, করোনা মহামারিতে আমি অনেকটা ঘরে বসা। আগে হাটে-বাজারে, পথে-পথে ঢোল বাজিয়ে গান গেয়ে কিছুটা উপার্জন করতাম। কিন্তু করোনার পর আর লোকজন তেমন জমায়েত হয় না, আমার গানও শুনেনা। ফলে আমার কামাইও নাই। ফলে একমাত্র আম্মার উপার্জনেই আমাদের চলতে হচ্ছে।

জাকির হোসেন বলেন, তাদের গ্রামে মুরগীর মাংস প্রসেসিং করার এক কারখানায় চাকুরি নিয়েছিলাম। কিন্তু চোখে ভালো দেখতে না পাওয়া কারখানা মালিক আমাকে কাজ থেকে ৬মাস আগে বাদ দিয়ে দেন। ফলে এখন আমি বেকার।

অন্ধ হাসিনা বলেন, আমার স্বামী একজন রাজমিস্ত্রী। অনেকটা দিন আনেন দিন খাই অবস্থা। আমার দুই সন্তান দেড় বছর বয়সী মারুফ ও ১৩ বছরের মেয়ে রূপা দুইজনই অন্ধ। অর্থের অভাবে সন্তানদের চিকিৎসা দিতে পারছিনা। বুঝতে পারছিনা তাদের ভবিষ্যৎ কি হবে।

জাকির হোসেন জানান, আমাদের এই করুণ অবস্থায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ি মো. সাদ্দাম হোসেন অনন্ত। অনন্ত করোনাকালে কিছুদিন চাল-ডাল সহযোগিতা করেছেন তিনি। আমার মেয়ে জোনাকির চোখের চিকিৎসা ও লেখাপড়ার সার্বিক সহায়তা করারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে জোনাকিকে প্রথমে গাজীপুরের এবিসি চক্ষু হাসপাতাল এবং সর্বশেষ ঢাকা ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন।

অন্ধ নাসরিন বলেন, তার ছেলে সিফাতও জন্মের সময় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েছিল। ৬ মাস বয়সে এক দানশীল ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে তাকে চিকিৎসা করান। এরপর সে কিছুটা দেখতে পেলেও দূরে কিছুই দেখে না। ব্যবসায়ি মো. সাদ্দাম হোসেন অনন্ত বলেন, অসহায় পরিবারকে দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। পরে করোনা মহামারীকালে তাদের চাল-ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সহায়তা দেই। পরে জোনাকির চোখের চিকিৎসা দেয়ার জন্য তাকে প্রথমে গাজীপুরের সালনায় এবিসি চক্ষু হাসপাতাল নেই। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকরা তার চোখের চিকিৎসায় অপারগতা প্রকাশ করলে ৬ জানুয়ারি তাকে ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যাই। ৮ জানুয়ারি তার চোখের বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সেখানকার চিকিৎসক ১৭ জানুয়ারি তার অপারেশন করে লেন্স লাগানোর আশ্বাস দিয়েছেন। ডাক্তার বলেছেন আল্লাহ চাইলে জোনাকির দৃষ্টি ফিরে আসতে পারে। সে হয়তো অজানা ও না দেখা এ পৃথিবীকে এবং নিজেকে ও নিজের স্বজনদের দেখতে পাবে। আর তখন এটাই আমার হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একটি আনন্দ।

এ ব্যাপারে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, তাদের ভাঙ্গা ঘর মেরামত ও ১০ কেজি চাল পাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। যাতে তাদের কিছুটা হলেও সমস্যা লাঘব হয়। আর প্রয়োজনে তাদের ঘর নির্মাণেরও ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করা হবে।

গাজীপুর কথা
গাজীপুর কথা