• সোমবার   ২৪ জানুয়ারি ২০২২ ||

  • মাঘ ১১ ১৪২৮

  • || ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

গাজীপুর কথা

নারকেলে মানুষের মুখাবয়ব, প্রচলিত কিছু উপকথা

গাজীপুর কথা

প্রকাশিত: ২৮ ডিসেম্বর ২০২১  

নারকেলের খোলসে দেখা যায়, এর শরীরে তিনটি ডট বা  গোলাকার চিহ্ন দেখা যায়। তিনটির কমও না, আবার তিনটির বেশিও না। মজার ব্যাপার হলো, এই তিনটি ডট দেখে মনে হয় কোনো মানুষের মুখের মতো। হয়ত মনে প্রশ্ন জাগে, নারকেলের গায়ে মানবমুখের আদলে তিনটি চিহ্নের সৃষ্টি হলো কিভাবে? এ নিয়ে প্রচলিত আছে বেশে কিছু উপকথা।

হিনা ও টুনার প্রেম

কুক দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত একটি দ্বীপ মানাহিকি বা মানিহিকি। এ দ্বীপ অঞ্চলের অধিবাসীদের বলা হতো মাওরি। এদের দেহের রং ছিল তামাটে। মানাহিকি কিংবা মাওরি কিংবদন্তিতে নারকেলের উৎপত্তি বিষয়ক এক করুণ কাহিনী প্রচলিত আছে।

প্রচলিত আছে যে, একসময়ে দেবতাদের সন্তানেরা পৃথিবীতে নেমে আসতেন। কেউ কেউ থাকত পৃথিবীতেই। ঠিক সে সময়ে মানাহিকি দ্বীপে থাকত আবেদনময়ী, সুন্দরী এবং কুমারী এক মেয়ে, যার নাম ছিল হিনা। পুরো দ্বীপে হিনা তার লাবণ্য ছড়িয়ে ঘুরে বেড়াত চঞ্চল হরিণীর মতো।

হঠাৎ চঞ্চল হিনা আস্তে আস্তে যেন শোকে-দুঃখে গুটিয়ে যেতে শুরু করল। সারা দ্বীপের মানুষের কাছে সেটি হয়ে উঠল আরো রহস্যময়। হিনার এহেন দুর্দশার কারণ অনুসন্ধানে নামে তাকে পছন্দ করা ‘মাউই’।

মানাহিকি দ্বীপের মানুষ স্নানের জন্য নিকটবর্তী একটি হ্রদে যেত। হিনা সাধারণত সন্ধ্যায় স্নানের উদ্দেশ্যে যেত সেই হ্রদে। কোনো এক সন্ধ্যায় স্নানকালে সে হ্রদের পানিতে দেখা পায় টুনা নামক এক সুদর্শন যুবকের। চোখে চোখে তাদের মধ্যে ভালোবাসার বিনিময় হয়ে যায়। নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় সমুদ্রের মাতাল হাওয়া আর স্রোতের মনোরম পরিবেশে তাদের মধ্যে মনের দেওয়া-নেয়া হয়ে যায়। তারা একে অপরের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।

কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে টুনা ছিলো একজন মারম্যান বা মৎস্যপুরুষ। মতান্তরে ইল মাছ। টুনার বাবা টাঙ্গারোয়া ছিলেন মৎস্যজগতের রাজা এবং তার রাজ্যকালে টুনা ছিল সবচেয়ে সুদর্শন। কিন্তু সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে হিনা টেরই পেল না যে, টুনা একজন মৎস্যপুরুষ। টুনা হিনার থেকে এক প্রতিশ্রুতি আদায় করে যে, হিনা কখনো টুনার অতীত বা তার অন্তর্ধান নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবে না বা খোঁজ করবে না। হিনাও কথা দেয় টুনাকে।

প্রথমদিকে হিনা সুখে থাকলেও আস্তে আস্তে তার মধ্যে হতাশা বাসা বাধতে শুরু করে। কারণ টুনা সাধারণত রাতের বেলা তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তাছাড়া আস্তে আস্তে হিনা আবিষ্কার করে যে, টুনা অন্য পুরুষদের মতো নয়। তার শরীর কেমন যেন ঠাণ্ডা আর চটচটে, মাছের শরীরের মতো।

হিনার এই হতাশা দ্বীপের মানুষের দৃষ্টি এড়ায়নি। দ্বীপের এমনই একজন ছিল মাউই। মাউই একদিন হিনার ওপর নজর রাখতে গিয়ে দেখলেন যে, রাতের বেলা হ্রদ থেকে এক যুবক ভেসে ওঠে এবং হিনার সঙ্গে দেখা করে। মাউইও ছিলো টুনার বাবা টাঙ্গারোয়ার প্রজন্ম। তাই সে সহজেই চিনে ফেলে টুনাকে।

টুনা চলে যাওয়ার পর মাউই যায় হিনার কুটিরে। হিনা এবং টুনার কথা তখনও মাউই ছাড়া আর কেউই জানেনি। তো মাউই হিনাকে ডেকে টুনা আর হিনার বিয়ের কথা জিজ্ঞাসা করে। হিনা মনে করে, মাউই কোনো এক দেবতা। মাউই নিজেকে দেবতা হিসেবেই পরিচিতি দেয় এবং বলে যে, হিনা তার স্বামীকে নিয়ে চিহ্নিত থাকে সবসময়। তাছাড়া টুনার শরীর যে ঠাণ্ডা ও চটচটে এবং সে দিনের বেলা আসে না সেটিও জানাতে ভোলে না মাউই। ফলে হিনার আর সন্দেহ থাকে না যে, মাউই একজন দেবতা।

এ সময়ে মাউই বলে যে, সে হিনার দুর্দশা লাঘব করবে। কিন্তু বিনিময়ে তাকে হিনার স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। হিনা তখন তাকে সসম্মানে প্রত্যাখ্যান করে, তবে মাউইকে তার দুর্দশা লাঘবের সুযোগও দেয়। কারণ তখনও সে জানতে পারেনি, আসলে কী হতে চলেছে।

অনুমতি পেয়ে মাউই বেরিয়ে পড়ে তার ক্যানো নৌকা নিয়ে এবং অপেক্ষা করতে থাকে টুনার। টুনাও বুঝে ফেলে যে, তার হয়তো আর রক্ষা নেই। তাই সেদিন রাতে হিনার সাথে দেখা করতে এসে টুনা বলে যে, তাকে হয়ত কেউ গলা কেটে হত্যা করবে। যদি তেমন কোনো কিছু ঘটে থাকে, তবে হিনা যেন তার মাথা নিয়ে তাদের মিলনস্থলে গিয়ে পুঁতে রাখে এবং চোখের জলে সেই জায়গা সিক্ত করে। সেখানে একসময় একটি গাছের জন্ম হবে, যার ফল খেয়ে হিনা এবং তাদের সন্তানেরা বেঁচে থাকবে।

সেদিন মাউই টুনার শিরশ্ছেদ করে। টুনার কথামতো হিনা তার মাথা নিয়ে পুঁতে রাখে এবং চোখের জলে সিক্ত করে। সেখানে জন্ম হয় নারকেল গাছের। আর প্রতিটি নারকেলে থেকে যায় টুনার দুঃখী মুখের অবয়ব এবং ছোবড়ার আকারে চুল। মাওরিদের বিশ্বাস, এভাবেই নারকেল এবং এর চোখ-মুখের সৃষ্টি হয়।

হিন্দু ধর্মীয় উপকথা

ভারতীয় সনাতন ধর্মেও নারকেলের উৎপত্তি বিষয়ক বর্ণনা পাওয়া যায়। মহাদেব শিবের ছিল তিনটি চোখ। শিবের কনিষ্ঠ পুত্র গণেশ শিবের এই তৃতীয় চোখের প্রতি আকৃষ্ট হন। শিব তার ধ্যানে বসলে গণেশ বারবার শিবের তৃতীয় নেত্র স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। এতে শিবের ধ্যানে ব্যাঘাত হচ্ছিল। তাই তিনি গণেশকে তিন চোখের একটি বলসদৃশ বস্তু সৃষ্টি করে দেন। এ বলের গায়ে শিবের চুলের মত জটাও তৈরি করে দেন তিনি।

বালক গণেশ সেই বল নিয়ে খেলতে থাকেন কৈলাসে। কিন্তু খেলতে খেলতে হঠাৎ তার হাত থেকে সে বল পড়ে যায় পৃথিবীতে। এরপর জল-মাটি পেয়ে সেই বল থেকে জন্ম নেয় নারকেল গাছ।

এল কুকো নামক প্রেতাত্মা

এল কুকো একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ করলে দাঁড়ায় প্রেতাত্মা। স্প্যানিশ উপকথায় এল কুকো হচ্ছে কল্পিত প্রেতাত্মা। সাধারণত ছোট বাচ্চাদের এল কুকোর ভয় দেখিয়ে শান্ত রাখা হতো এবং ঘুম পাড়ানো হতো।

এল কুকোর কাহিনীর মূল পাওয়া যায় পর্তুগিজ এবং গ্যালিসিয়ান উপকথায়। প্রকৃতপক্ষে নারকেলের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘কোকোনাট’ এসেছে এই জটা চুলের এল কুকো প্রেতাত্মার নাম থেকে। যখন পর্তুগিজরা সারা বিশ্বে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার করছিল, তখন তারা এই নারকেলকেও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেয়। সেই সাথে পৌঁছে দেয় এর কাহিনী।

এল কুকোর সঠিক চিত্র পাওয়া সম্ভব হয়নি। বাবা-মা তাদের নিজেদের মতো করে এল কুকোর চেহারা বর্ণনা বাচ্চাদের শান্ত রাখতেন। যেহেতু নারকেলের ইংরেজি নাম এসেছে এই এল কুকো থেকে, কাজেই নারকেলকে এল কুকো প্রেতাত্মার চেহারা কল্পনা করা হয়।

গাজীপুর কথা
গাজীপুর কথা