শনিবার  ২০ আগস্ট ২০২২,   ভাদ্র ৪ ১৪২৯,  ২২ মুহররম ১৪৪৪

Gazipur Kotha | গাজীপুর কথা

ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: ১০:২৭, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু

ভাষাযোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। এটি শুধু চিন্তা-চেতনা, মনন ও মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যমই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশ ও জাতির আত্মপরিচয়। হাজার বছর ধরে বাংলা ভাষা প্রকাশ করে যাচ্ছে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ১৯৪৭ সালে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে কোনো মিল না থাকার পরও শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে ১২শ’ মাইল ব্যবধানের দুটি পৃথক ভূখণ্ডকে এক করে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে শুধু ৭.২ শতাংশ মানুষ কথা বলত উর্দুতে। সেই উর্দুকেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষা করার জন্য জোর পাঁয়তারা শুরু করে। কিন্তু বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তা হতে দেয়নি।
দেশভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধু প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরপরই যুক্ত হন ভাষা আন্দোলনে। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে ভাষা বিষয়ক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। এসব প্রস্তাব পাঠ করেন শেখ মুজিব। তিনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হোক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ (সূত্র : বাংলাপিডিয়া)
১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলের তমদ্দুন মজলিশ ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথসভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। এ সভায় উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, আবুল কাশেম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজিত গুহসহ অন্য নেতারা। সভায় রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। এদিন ভাষার দাবিতে প্রথম হরতাল পালিত হয়। এটাই হলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম হরতাল। হরতালের নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিবুর রহমান। ওইদিন তিনি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটি ছিল পাকিস্তানে কোনো প্রথম রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার। (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জীবন ও রাজনীতি, বাংলা একাডেমি)। 
ভাষা আন্দোলন থেমে থাকে না। আস্তে আস্তে তা গণআন্দোলনে রূপ নিতে থাকে, শহর থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে। আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন ছাত্র ও তরুণরা। তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৪৯ সালে দুবার গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। ওই বছরের অক্টোবরে তাকে আটক করে পাকিস্তান সরকার, মুক্তি পান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে। তবে জেলে বসে নিয়মিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করতেন তিনি।
ভাষাসৈনিক গাজীউল হক তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন- ‘১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জনাব শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন জেলে আটক ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে জেলে থেকেই তিনি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।’ (গাজীউল হক, আমার দেখা আমার লেখা, পৃষ্ঠা-৪০)। একই কথা লিখেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ‘একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়েছেন। ’ (সূত্র: ভালোবাসি মাতৃভাষাপৃষ্ঠা: ৬২)।
ভাষা আন্দোলনের পর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদান, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু, সংসদের দৈনন্দিন কার্যাবলি বাংলায় চালু প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান আইন সভায় গর্জে ওঠেন এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বীরোচিত ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধুসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ওইদিনও তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি জানান। 
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলা ভাষায় সংবিধান প্রণীত হয়। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান সরকারি কাজে বাংলাভাষা প্রচলনের প্রথম সরকারি নির্দেশ জারি করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভাষা-আন্দোলনেরই সুদূরপ্রসারী ফলশ্রুতি।’ (দৈনিক সংবাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫)। একইভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রথম বাংলায় বক্তব্য দিয়ে বিশ্বসভায় বাংলাকে তুলে ধরেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
আমাদের বহু ভাষাবিদ ও বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তাদের উৎসাহ দিতে হবে যেন বাংলায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। এতে বাংলা ভাষার প্রসার ঘটবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, গবেষণাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। আর সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার করতে পারলে আমরা বিশ্বে নিজেদের আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। আর এটি-ই হতে পারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রেষ্ঠ পন্থা। বাংলা তো বটেই, পৃথিবীর সর্বত্র সব মাতৃভাষা আপন গতিতে বিস্তার লাভ করুক এটাই প্রত্যাশা।
ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ

গাজীপুর কথা