শনিবার  ২৫ জুন ২০২২,   আষাঢ় ১১ ১৪২৯

Gazipur Kotha | গাজীপুর কথা

বঙ্গবন্ধুর সাদামাটা জীবন ও আমাদের বোধের শিক্ষা

প্রকাশিত: ১৭:২২, ২২ মে ২০২২

আপডেট: ২০:৪৩, ২৪ মে ২০২২

বঙ্গবন্ধুর সাদামাটা জীবন ও আমাদের বোধের শিক্ষা

আজকাল ভীষণভাবে উপলব্ধি করি আমাদের গ্রাম এবং শহরে মানুষগুলোর জীবনধারাকে নিয়ে। তাদের বেঁচে থাকা, তাদের সংগ্রামমুখর জীবন, তাদের চলাফেরা সবকিছু নিয়েই এক ধরনের চিন্তার অবকাশ হয়। রবীন্দ্রনাথ পড়েছি। নজরুলকে জেনেছি। জীবনানন্দকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি। হয়তোবা সেই উপলব্ধির গভীরতা দার্শনিকতাকে স্পর্শ করে না। তবে আজকাল এসব মনীষীদের নিয়ে পড়া কিংবা উপলব্ধির পাশাপাশি ভীষণভাবে অনুভব করলাম বাংলাদেশকে জানতে হলে, বুঝতে হলে আসলে আরেকজনকে না জানলেই নয়। যার মতাদর্শ চিন্তা-দর্শন বাংলাদেশকে নিয়ে। বাংলাদেশের গ্রাম এবং শহরকে নিয়ে। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিশেষ করে বর্তমানে যেমন আমাদের গ্রাম গুলো এবং শহরগুলো বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গড়ে উঠছে ঠিক তখন উপলব্ধি করতে শিখলাম যিনি দেশকে গঠন করেছেন দেশের স্বাধীনতা নিয়ে এসেছিলেন তিনি কিভাবে দেশকে দেখতে চেয়েছেন। দেশের উন্নতি কে দেখতে চেয়েছেন! দেশের প্রত্যেকটি গ্রাম এবং শহরকে সাজাতে চেয়েছিলেন সহজ সরল গ্রাম মানুষের জীবনবোধ থেকে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা এবং চেতনার পরিস্ফুটন ঘটাতে হলে একদিকে যেমন তার রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন ঠিক তেমনি তার মতাদর্শ শহর নগর কেন্দ্রিক দর্শন, পরিবেশ দর্শন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সেই সময়ের সাথে বর্তমান সময়ের একটি যোগসাজশ প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে জানতে হলে তার পূর্ণাঙ্গ দর্শন জানা অত্যন্ত প্রয়োজন সময়ের প্রেক্ষিতে দল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে।

যেমন ধরা যাক ধানমন্ডির স্মৃতি ভরা ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটির কথা। যে বাড়িতে একসময় মা-বাবা ভাই-বোন সবাই মিলে দোতালায় গল্প হয়েছে। আড্ডা হয়েছে। একসঙ্গে থাকা হয়েছে। কখনো কখনো আবার রাগ হয়েছে কিংবা ভাইবোনদের মধ্যে খুনসুটি হয়েছে। সেই বাড়িতে বসেই বাইরের কত পরিবেশ, মিছিল-মিটিংয়ে উপলব্ধি করেছে সেই বাড়িতে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো। যখন ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে বাড়ির ছোট্ট ছেলেটির জন্ম হয় তখনও কিন্তু সেই ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি দোতালা হয়নি। শুধুমাত্র কয়েকটা ঘর হয়েছিল। যার উত্তর-পূর্ব কোণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ঘরেই ছোট্ট রাসেলের জন্ম হয়। প্রধানমন্ত্রী তার লেখনীতে বলেছিলেন – “মনে আছে আমাদের সেকি উত্তেজনা! আমি, কামাল, জামাল, রেহানা, খোকা, কাকা অপেক্ষা করে বসে আছি। বড় ফুপু মেজোবউ তখন আমাদের বাসায়। আব্বা তখন ব্যস্ত নির্বাচনী প্রচার কাজে। বাসায় আমাদের একা ফেলে মা হাসপাতাল যেতে রাজি না। তাছাড়া এখনকার মত এত ক্লিনিকের ব্যবস্থা তখন ছিল না। এসব ক্ষেত্রে ঘরে থাকা রেওয়াজ ছিল। ডাক্তার নার্স সব এসেছে। রেহানা ঘুমিয়ে পড়েছে। ছোট্ট মানুষটা আর কত রাত জাগবে। জামালের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। তবু জেগে আছে কষ্ট করে নতুন মানুষের আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়।…” আর এভাবেই অনেক আনন্দ হাসি ভালবাসার মধ্যে কেটে যেত ৩২ নম্বর সড়কের পাশের বাড়িতে। যার প্রত্যেকটি দেয়াল অনেক ইতিহাসের সাক্ষী।

এই বাড়িটির কথা আজকে বলছি কারণ বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের সকল গল্প লুকিয়ে রয়েছে এই বাড়িটির প্রত্যেকটি পড়তে পড়তে। সেই সময়টাতে তখনও দোতালায় ওঠার সিঁড়ি হয়নি এমনকি অনেক দেয়ালের প্লাস্টার হয়নি। বঙ্গমাতা খুব ধীরে ধীরে টাকা জমিয়েছিলেন অনেক কষ্টে। হাউজ বিল্ডিং এর লোনের টাকা দিয়েই বাড়ি তৈরি করেন। অত্যন্ত কষ্ট করে ধীরে ধীরে প্রত্যেকটি ইটের পরে ইট দিয়ে তৈরি হয় বাড়ি। অন্যদিকে যেমন বঙ্গবন্ধুর মাঝেমধ্যে জেলে চলে যেতেন। তখন ঠিক সব কাজ বন্ধ হয়ে যেত। আর সে কারণেই এ বাড়িটি তৈরি করতে অনেকদিন সময় লেগেছিল। এমনও সময় হয়েছে গহনা বিক্রি করে বঙ্গমাতাকে সংসার চালাতে হয়েছিল। সংগঠনের জন্য অর্থ যোগান দিতে হয়েছিল। আর এই যে দোতালায় ওঠার সিঁড়ি সেই স্মৃতি আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুব পছন্দের একটি জায়গা ছিল। সেখানে বসে কত গল্প হত কথা হতো তার লেখনীতে দেখা যায়। সে তার জীবনের অনেক সুন্দর সময় কাটিয়েছিল যখন চায়ের কাপটা তার হাতে ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে সেখানে আলাপ করতে। মাটিতে ঢালাও বিছানা করে ঘুমানোর মধ্যে যে কি মজা ছিল! বারান্দায় চুলা পেতে রান্না করা, সবাই মিলে লুকোচুরি খেলা আর সেই খেলা যেন দিন রাতে শেষ হতো না! এমন অনেক সুন্দর সুন্দর সময় কেটেছিল এই বাড়িতে।

এই ৩২ নম্বর বাড়িটির কথা এই কারণেই বলছি যে বাড়িটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে অন্যতম একটি প্রধান অংশ হয়ে আছে। এখানে বসে বঙ্গবন্ধু তার জীবনের একটি সময় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। এই বাড়িটিতে তিনি সপরিবারে থাকতেন। এই বাড়িটিতে ছিল গভীর মমত্ব আর ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকতো চারটে দেয়াল। বাড়ির চারপাশে ছিল বেশকিছু খোলা ও ফাঁকা জায়গা। যেখানে ছিল সবুজ গাছপালা আর ঘাস। গাছপালা গুলোর জন্য ছায়াময় থাকতো এই বাড়িটি সব সময়। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন গাছপালার সাথে আবাসস্থল এর একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। যে সম্পর্ক ঘরের চার দেয়ালের বাইরের জগতটার সাথে এর ভেতরকার মানুষের সম্পর্ক আরো দৃঢ় করে। গাছপালা গুলো কে ঘিরে বাড়ির আঙিনা জুড়ে খেলা করতো বাংলার পাখিরা। পাখিদের জন্য এই বাড়িটি ছিল অভয়ারণ্য। যেখানে ছিল না কোন ভয় ছিল শুধু উড়ে চলার প্রাণশক্তি। পাখিদের ডাকে সারাবেলা ভোর থেকে বাড়িটি মুখরিত থাকতো। সেই সময় বাড়িটিতে ছিল অনেকগুলো কবুতর। তাদের থাকার জন্য ছিল কবুতরের বাসা। বঙ্গবন্ধু যখন সময় পেতেন কিছুক্ষণ সময় কাটাতেন এই কবুতরদের সাথে। নিজ হাতে খাবার তুলে দিতে ভুল করতেন না। বাড়ির চারপাশের গাছ গুলোতে নিয়মিত পানি দিতেন। আগাছা পরিষ্কার করতেন নিজ হাতে। এই বাড়ীর আঙ্গিনার কাজ করতে করতে নিজের মনের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পেতেন। বাবার সাথে এই গাছপালার দেখাশোনা পাখিদের সাথে সময় কাটানো সবকিছুর সাথেই ছিল তার আদরের ছোট্ট ছেলেটি। বঙ্গবন্ধুর এই সাদামাটা জীবন থেকে অনেক কিছু শেখার আছে অনেক কিছু জানার আছে যেখানে মিশে রয়েছে আপামর জনসাধারণের অল্প কিছু নিয়ে ভালো থাকার প্রয়াস। আর সেখানেই সার্থকতা।

এই বাড়িতে ঢুকতেই বাম পাশের সিঁড়ি কিংবা খোলামেলা বসার ঘর। অত্যন্ত ছিমছাম কিন্তু পরিপাটি। বসার ঘরের দেয়ালে ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, একে ফজলুল হক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের ছবি। খুব সাদামাটা ড্রইং রুমের পাশেই ছিল লাইব্রেরীর। বই গুলো দেখলে বোঝা যেত সেখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি রাজনৈতিক দর্শনের বই রয়েছে। বঙ্গবন্ধু বই পড়তে ভালোবাসেন। রাত জেগেও বই পড়তেন। এমনকি কারাগারে গিয়েও বেশিরভাগ সময় নিজের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করতে বইয়ের সাথে সময় কাটাতেন লিখতেন। আর এভাবেই তিনি তার নিজের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পেতেন। নিজের জগতকে প্রসারিত করতেন। নিজের সময়কে কিভাবে দেশের জন্য মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করা যায় নিয়োজিত করা যায় এই বিষয়গুলো সব সময় তার চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ছিল। যা তার লেখনীর মধ্যে পাওয়া যায়। বিভিন্ন লেখনি থেকে আরও দেখা গেছে এই বাড়িটির রান্নাঘরের চুলা সব সময় জ্বলন্ত থাকতো। কারণ বাড়িতে দিনের সব সময় কেউ না কেউ উপস্থিত হতেন। আর মমতাময়ী মা বঙ্গমাতা কাউকেই না খাইয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করতেন না। তিনি নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করতেন। বঙ্গবন্ধু বাড়িতে থাক আর না থাক। তিনি এই বাড়িটির প্রত্যেকটি আনাচে-কানাচে এক গভীর মমত্ববোধ এবং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য যিনি সাংসারিক দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন অবিরতদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য যিনি সাংসারিক দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন অবিরত আর এভাবেই তিনি বঙ্গমাতা হয়ে উঠেছিলেন।

উপরের তলায় সারি সারি কয়েকটি শোবার ঘর। বঙ্গবন্ধুর ঘরে একটি বড় খাট ও ম্যাট্রেস বিছানো ছিল। হালকা রঙের চাদর বিছানো থাকত সবসময়। সামনে ছিল খোলা বারান্দা যেখানে দাঁড়ালে ধানমন্ডি লেক থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুই খুব সুন্দর এবং পরিষ্কারভাবে দেখা যেত। এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু সামনে দাঁড়ানো জনগণের ভালোবাসার জবাব দিতেন। এই বাড়িটি একসময় দুতলা থেকে তিনতালা পর্যন্ত উঠে। পাশাপাশি কয়েকটি শোবার ঘর তৈরি করা হয়। কিন্তু ঘরগুলোর সাজানোর ক্ষেত্রে কোন জাকজমকতা ছিলনা। আটপৌরে বাংলার মধ্যবিত্ত পরিবারের খুব সহজ সাধারণ সমীকরণ ছিল। পরিবারটি ছিল একান্নবর্তী মধ্যবিত্ত পরিবার। যেখানে মা বাবা ভাই বোনের ভালোবাসা ছিল। নিবিড় পরশ ছিল। আর দশটি বাঙালি বাড়ির মতো হলেও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করেছিল। যে পরিচয় বাঙালি জাতিকে একটা সময় আশার আলো জ্বালিয়ে ছিল।

এ বাড়িতে বসেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। অনেক কঠিন সময়েও বঙ্গবন্ধু এ বাড়িটি ছেড়ে যাননি। এ বাড়ির দেয়ালগুলোতে আজও রয়েছে বুলেটের ক্ষতচিহ্ন। একসময় বিজয় অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে এসেই তিনি এ বাড়িতে ওঠেন। তখন থেকে আজ অবধি বাড়িটি বাংলাদেশের সব থেকে বড় তীর্থস্থান। তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি। অনেক সুযোগ সুবিধা থাকার পরেও তিনি পরিবারকে নিয়ে থেকে ছিলেন এই বাড়িটিতে। এই বাড়ির সবুজ ঘাসে পা রেখেছিলেন। এই বাড়ির আঙিনায় সূর্যের কিরণে নিজেকে মুক্ত করেছিলেন নতুন এক সংকল্পে। যে সংকল্প ছিল একটি সুন্দর সবুজ দেশ গড়ার। এই বাড়িটির সহজ সরল জীবন তার অত্যন্ত পছন্দের ছিল। তিনি নিরাপত্তার কথা একবারও ভাবেননি। যতবার জেলে গিয়েছেন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি বাড়িতে উঠেছেন। পরিবারের সবাইকে কাছে পাওয়ার জন্য। তিনি বারবার ফিরে গিয়েছেন এই বাড়িতে। হয়তোবা অনেক অভাব অনটনের মধ্যে তাকে সময় পার করতে হয়েছে। তবুও শত বাধা-বিপত্তি সব কিছু সামাল দিয়ে তিনি ফিরে ফিরে গেছেন। এই বাড়িটির প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ। আর তার এই প্রিয় বাড়িটিতেই তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয় নৃশংসভাবে। সেদিন স্তব্ধ হয়েছিল বাংলার আকাশ বাতাস মাটি। বন্ধ হয়েছিল পাখিদের কলকাকলি। যার রক্তক্ষরণ আজও বাঙালির হৃদয়ে সদা বহমান। যে বাড়িটিকে ঘিরে তার এত স্বপ্ন ভালোবাসা আর মমত্ববোধ ছিল সেই বাড়িটির প্রত্যেকটি পরোতে পরোতে বঙ্গ-পরিবারের স্নেহ-ভালবাসা মাখা সময় গুলো-জীবন যাত্রার সাধারণ পর্ব গুলো আরো সুন্দর ভাবে বিন্যাস করে বাংলাদেশের তথা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম সাধারণভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন খুঁজে পাবে। দিকনির্দেশনা পাবে ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের।

লেখকঃ শিক্ষক, স্থপতি ও গবেষক

গাজীপুর কথা