• রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৪ ১৪২৮

  • || ১২ সফর ১৪৪৩

সিরিজ বোমা হামলা: জঙ্গিবাদী রাজনীতির হাতিয়ার

গাজীপুর কথা

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২১  

এখন যাদের বয়স ২০ থেকে ২৫ তাদের হয়তো খুব বেশি মনে নেই এই দিনটির কথা। যাদের বয়স আরও কম তারা হয়তো খুব একটা জানে না যে, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশে কী ঘটেছিল? আবার যাদের বয়স ২৫-এর ঊর্ধ্বে তাদের মোটেও ভুলে যাওয়ার কথা নয়, ওইদিন বাংলাদেশের ৬৩টি জেলার ৩ শতাধিক স্থানে সকাল ১১টার পর একসঙ্গে ৫ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণের ঘটানোর ঘটনার কথা।

এ ধরনের পরিকল্পিত বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলে একটি ভয়ংকর আতঙ্ক ছড়ানোর যে বার্তা বোমা নিক্ষেপকারীরা দিয়েছিল সেটি আমাদের দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের সাধারণ বোধ, বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে মোটেও যায়নি।

এই ঘটনার আগে বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গিরা কাউকে বা কোনো স্থাপনাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করেছিল। তাতে কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেন, কেউ আহত হন, কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু একসঙ্গে দেশব্যাপী শত শত বোমা হামলা হবে, মানুষ আক্রান্ত হবে সেটি অনেকেরই ধারণার বাইরে ছিল। কিন্তু ১৭ আগস্ট সংগঠিত হওয়ার পর যেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হচ্ছে, এই সিরিজ বোমা হামলার বিষয়টি তখন আর বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে হামলাকারীদের আক্রমণের বিষয় ছিল না, এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার মতো শক্তি রাখে এমন কোনো ক্ষমতাধর শক্তিশালী গোষ্ঠীর বড় ধরনের ঘটনা সংগঠিত করার রিহার্সেল বা পূর্বপ্রস্তুতি বলে জানান দেয়া হয়েছিল।

বার্তাটি শুধু বাংলাদেশের জনগণকেই দেয়া হয়নি, গোটা বিশ্বের সব মহলকেও জানিয়ে দেয়া হয় যে, যেকোনো মুহূর্তে এই শক্তি বাংলাদেশকে একটি জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে। বার্তাটি আন্তর্জাতিক মহল সেভাবেই বুঝেও নিয়েছিল। সে কারণেই আন্তর্জাতিক কোনো কোনো দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশকে একটি জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে হাঁটছে বলে অভিমত প্রকাশ করে।

আবার কেউ কেউ বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বলেও অভিহিত করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো- সেই সময়ের ক্ষমতায় থাকা সরকার আগে থেকেই বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের অভয়াশ্রমে পরিণত হওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিচ্ছিল, জঙ্গিবাদ মিডিয়ার সৃষ্টি বলেও সরকারের অন্যতম মিত্র সংগঠন, জামায়াত নেতা ও মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীর মন্তব্য সব সচেতন মহলকে হতবাক করেছিল।

অথচ রাজশাহী অঞ্চলে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই এক ধরনেরর স্থানীয় রাজত্ব কায়েম করে বসে ছিল। তার বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছিল। মানুষকে ধরে ধরে নির্যাতন করা, তাদের স্বাধীনভাবে চলা, মতপ্রকাশ করা ইত্যাদিকে বাংলা ভাই তার ইচ্ছেমতো মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়ে বন্ধ করে রাখত। সেখানে থানা পুলিশ বাংলা ভাইয়ের নির্যাতনী কর্মকাণ্ড স্বেচ্ছাচারিতা, আইন হাতে তুলে নেয়া ইত্যাদির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।

এমপি, মন্ত্রীসহ অনেকেই বাংলা ভাইয়ের কর্মকাণ্ডের সমর্থক ছিল। সরকার যাত্রাপালাও বন্ধ করে দিয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা ঘটার পরও সরকারের একটি অংশ থেকে বলা হচ্ছিল বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। অবশেষে ১৭ আগস্ট ‘মিডিয়ার সৃষ্টি’ বাংলা ভাইয়ের রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতাকর্মীরা দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে নিজেরাই জানান দিলো যে, তারা মন্ত্রীর কথামতো মিডিয়ার তৈরি নন, বাস্তবেই তারা আছে এবং কী করতে পারে!

১৭ আগস্টের ঘটনা সংঘটিত করার আগে জেএমবির সদস্যরা একের পর এক বোমা হামলার ঘটনায় অংশ নেয়। তারা শাহ এমএস কিবরিয়াকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় আর্জেস বোমা নিক্ষেপ করার মাধ্যমে যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিল, সেটি ছিল ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর দ্বিতীয় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।

সৌভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা সেই গ্রেনেড হামলায় বেঁচে গেলেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত, ৫ শতাধিক আহত হন। এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পেছনে তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। অংশগ্রহণকারী জঙ্গিদের কয়েকজনকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতেও সাহায্য করা হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান বিচারে দণ্ডিত হন। এছাড়া আরও অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় এখন কারাগারে চূড়ান্ত রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে।

২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত জঙ্গিদের শুধু উত্থানই নয়, আস্ফালনও দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক মহল লক্ষ করেছে। বাঙালি বংশোদ্ভূত ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরী ২০০৪ সালের ২১ মে শাহজালাল (রহ.) মাজার-মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর অতর্কিত জঙ্গিদের বোমা হামলায় আক্রান্ত হন। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও ঘটনাটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের কলঙ্কের ছাপ রেখে যায়। সরকার নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই হামলায় জড়িতদের ধরে বিচারের সম্মুখীন করে। এতে তিনজনের মৃত্যদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। একই রায়ে আরও দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

সেই সময় বাংলাদেশে ১০ ট্রাক বিদেশি অস্ত্র ঘটনাচক্রে ধরা পড়ে যায়। এছাড়া বগুড়ার কাহালুতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নানা ধরনের অস্ত্র মজুদ এবং পাওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়।

বোঝাই যাচ্ছিল দেশের অভ্যন্তরে নানা গোষ্ঠী সশস্ত্র পন্থায় দেশকে অস্থিতিশীল করা কিংবা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহের বিদ্রোহীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ার একটি ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে সাহায্য করেছিল। মূলত সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর ফলে বাংলাদেশ এবং ভারতের সঙ্গেই শুধু নয়, অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে বড় ধরনের চিড় ধরতে থাকে।

এর কারণ হচ্ছে ২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী রাজনৈতিক দল তথা অসাম্প্রদায়িক দল গোষ্ঠী ও ব্যক্তির ওপর বড় ধরনের নির্যাতন, শারীরিকভাবে উৎখাত এবং এলাকা ও দেশ থেকে বিতাড়নের যে অভিযান চলছিল সেটির মূল লক্ষ্য ছিল দেশকে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী ও তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত করা। ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে জেএমবি দেশের সর্বত্র তাদের শক্তির মহড়া একের পর এক প্রদান করে। এর চূড়ান্ত মহড়া হয়েছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এবং ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট।

আগস্ট মাসটি তাদের পছন্দ ও আদর্শেরও বটে! এই মাসের ১৪ তারিখ পাকিস্তান দিবস, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ৪৭-এর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভাবাদর্শের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছিল।

সে কারণেই ২১ আগস্ট এবং ১৭ আগস্ট সংঘটিত করার পেছনের নেপথ্য শক্তি জেএমবিকে সরাসরি ব্যবহার করে। এই শক্তির উত্থান ৮০ এবং ৯০-এর দশকে আফগান সংকটকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকে। এদের সঙ্গে জামায়াত এবং আরও কিছু উগ্র ডানপন্থার মৌলবাদী রাজনৈতিক দল যুক্ত ছিল। তবে সেই সময় তারা গোপনে তৈরি হচ্ছিল। মূল রাজনৈতিক সংগঠনের সশস্ত্র জিহাদী বাহিনী হিসেবে এরা একসময় মাদ্রাসার ছাত্রদের, পরে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের যুক্ত করে।

মূলত, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এরা বেশ কিছু অপারেশন গোপনে সংঘটিত করে। এর মাধ্যমে তারা গুপ্ত সংগঠন ও জিহাদি বাহিনী হিসেবে মহড়া দিতে থাকে।

এদের উল্লেখযোগ্য আক্রমণগুলো হচ্ছে যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা বিস্ফোরণ, সিপিবির জনসভায় বোমা বিস্ফোরণ, কোটালিপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় বিস্ফোরণ ঘটানোর উদ্দেশ্যে বোমা পুঁতে রাখা, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলা, ২০০১ সালে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো ইত্যাদি। এই ঘটনাগুলো যখন ঘটানো হয়, তখন অনেকের কাছেই ধর্মের নামে কেউ গুপ্ত সংগঠনের আড়ালে বোমাবাজি ও মানুষ হত্যা করতে পারে এমনটি বিশ্বাস করার মতো ছিলো না। সেই সুযোগটি তারা তখন ব্যবহার করে।

২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারের অংশীদার অংশে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্ষমতায় থাকার দুর্বলতার কারণে গুপ্ত সংগঠনের এই গোষ্ঠী অনেকটা প্রকাশ্যেই চলে আসে এবং ৫ বছর ক্রমাগত বোমা হামলা চালিয়ে যেতে থাকে।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার আগে দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেটি দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সমর্থন লাভ করে। তিনি সন্ত্রাসের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করায় জঙ্গিরা কোণঠাসা হতে থাকে, একইভাবে সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বৃদ্ধিতে সমর্থন লাভ করে। তবে জঙ্গিরা তখন তাদের নাম ও কৌশল পাল্টায় এবং বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে আক্রমণ, পুরোহিতদের হত্যা ইত্যাদি সংঘটিত করতে থাকে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে ২২ বিদেশিকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করে। এর ১ সপ্তাহ পর শোলাকিয়া ঈদ জমায়েতে বোমা হামলা করে। এসময় থেকে তারা সিরিজ বোমা হামলা বিভিন্ন জায়গায় ঘটাতে থাকে। সরকারও এদের দমনে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে এর ফলে বাংলাদেশে জঙ্গিরা অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তবে জঙ্গিদের মতাদর্শ সাম্প্রদায়িকতার বিস্তারের কারণে সমাজে উঠতি তরুণদের একটি অংশের মধ্যে অত্যন্ত গোপনে বিরাজ করছে। এদের একটি অংশ আইএসএ যোগ দিতে মধ্যপ্রাচ্য পাড়ি দিয়েছিল।

আল কায়েদা, তালেবানসহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে এদের কেউ কেউ বিদেশ থেকে যোগাযোগ রক্ষা করছে। আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা পুনর্দখলের সংবাদে এরা বেশ উল্লসিত। এখন অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির সম্মুখে বড় কাজ হবে এসব উগ্র, হঠকারী মতাদর্শের প্রভাব থেকে তরুণদের মুক্ত রাখা এবং বিশ্ব বাস্তবতার জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন-ইতিহাস, শিল্পকলা ইত্যাদির চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা। তাহলেই ভবিষ্যৎ উগ্রচিন্তা, চোরাগোপ্তা হামলা ও জঙ্গি সংগঠন থেকে মুক্ত হতে পারবে।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

গাজীপুর কথা
গাজীপুর কথা