• সোমবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৪ ১৪২৮

  • || ১২ সফর ১৪৪৩

২২ বছর পর ধরা ফাঁসির আসামি

গাজীপুর কথা

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২১  

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদকে ১৯৯৯ সালে হত্যার পর রাজশাহীতে চলে যান অন্যতম খুনি রওশন ওরফে আলী ওরফে উদয় মণ্ডল। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে নিজের নাম-ঠিকানা পরিবর্তন করে শুরু করেন নতুন জীবন। চেহারায় ভিন্নতা আনতে ফেলে দেন মুখের দাড়ি। প্রথম দিকে রাজশাহীতে নিজেকে আলী নামে পরিচয় দিলেও মেহেরপুরের গাংনীর বাসিন্দা রওশন পরে উদয় মণ্ডল নামে গাজীপুরের ঠিকানায় জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেন। দীর্ঘ সময় রাজশাহীতে থেকে সেখানেই গড়ে তোলেন গরুর খামার।

অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুনি রওশনকে গ্রেফতারে দীর্ঘদিন ধরে অভিযান চালিয়েও তার কোনো হদিস পাচ্ছিল না। পরে একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ওই মোবাইল নম্বরটি দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন রওশন। নম্বরটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও এক সময় সচল করেন তিনি। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের এ তথ্যের সূত্র ধরেই তার বাসার নম্বর খুঁজে পায় র‌্যাব। সম্প্রতি অভিযানে রাজশাহীর শাহ মখদুম থানার ভারালীপাড়া এলাকা থেকে রওশনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

র‌্যাব জানায়, জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ হত্যাকাণ্ডসহ একাধিক মামলার আসামি রওশন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এ আসামি ছিলেন একজন ‘সিরিয়াল কিলার’। কাজী আরেফ ছাড়াও স্থানীয় চেয়ারম্যান এবং আরও ছয়-সাতজনের হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া ও পরিকল্পনার সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

জানা যায়, ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি সভা চলাকালে প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত গুলিতে নিহত হন কাজী আরেফসহ পাঁচজন। ওই ঘটনায় দৌলতপুর থানায় একটি মামলা হয়। মামলায় ২৯ জনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৪ সালের ৩০ আগস্ট কুষ্টিয়া জেলা দায়রা জজ আদালত ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

jagonews24

জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৯৯ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন

এরপর আসামিরা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। ২০০৮ সালের ৫ আগস্ট উচ্চ আদালত ৯ আসামির ফাঁসি বহাল রাখেন। বাকি ১৩ জনকে খালাস দেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারি তিন আসামির ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। এছাড়া একজন আসামি কারাগারে মারা যান। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য পাঁচ আসামি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রেফতার হন খুনি রওশন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রওশন স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে রাজবাড়ীর একটি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এরপর ১৯৯২ সাল থেকে সীমান্তবর্তী চোরাচালান, হাট ইজারাসহ বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের কাজে সম্পৃক্ত হন। এসব কাজে তিনি এলাকায় সন্ত্রাসী চক্র গড়ে তোলেন। তার সঙ্গে চরমপন্থি দলের সখ্যও তৈরি হয়। ১৯৯৮ সাল পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হন তিনি। এ সময় মাঝে মধ্যে গাঢাকা দিতে রাজশাহীতে অস্থায়ীভাবে অবস্থান নিতে শুরু করেন রওশন।

রাজশাহীতে আসল পরিচয় গোপন করে ‘আলী’ নামে নিজেকে পরিচয় দিতেন তিনি। এছাড়া রাজশাহীতে তার আদি নিবাস গাজীপুর বলে সবাইকে জানাতেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি একটি গরুর খামার স্থাপন করেন। পরে জমি কেনা-বেচার ব্যবসায় যুক্ত হন। এভাবে ধীরে ধীরে রাজশাহীতে স্থায়ী নিবাস গড়েন তিনি। সেখানে অবস্থানকালে ‘উদয় মণ্ডল’ নামে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি করেন।

দীর্ঘদিন ধরে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এ আসামিকে গ্রেফতার করতে অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া নাটোর র‌্যাব সিপিসি-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. সানরিয়া চোধুরী বলেন, ‘কাজী আরেফ হত্যাকাণ্ডের আসামি রওশনকে গ্রেফতারে আমাদের কাছে প্রাথমিক তথ্যের মধ্যে ছিল একটি ওয়ারেন্টের কপি ও একটি মোবাইল নম্বর। মোবাইল নম্বরটিতে তিন মাসের কল রেকর্ড পাওয়া যায়। নম্বরটি থেকে খুব বেশি কারও কাছে ফোন করা হতো না, তবে নম্বরটিতে মিসড কল অ্যালার্ট সার্ভিস চালু ছিল। নম্বরটি বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকতো। এ ফোন নম্বরের সূত্র ধরে জানতে পারি, প্রতি মাসে নম্বরটি মিসড কল অ্যালার্ট সার্ভিসের এসএমএস আসতো এবং সেই নম্বরটি থেকে আরেকটি নম্বরে প্রায়ই কথা বলা হতো। পরে জানা যায়, ওই নম্বর থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নর্দার্ন ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডে (নেসকো) বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয়। এরপর নেসকো অফিসে যোগাযোগ করে বিদ্যুৎ বিলের কপি সংগ্রহ করা হয়। সেখানে রওশনের বাসার ঠিকানা ছিল। কিন্তু বিলে মালিকের নাম ছিল ফাতেমা (রওশনের স্ত্রীর নাম), স্বামীর নাম ছিল উদয় মণ্ডল।

র‌্যাবের এ কোম্পানি কমান্ডার আরও বলেন, ‘এরপর যে নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত চলতে থাকে সে নম্বরটির বিপরীতে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়। জাতীয় পরিচয়পত্রেও নামের জায়গায় উদয় মণ্ডল লেখা ছিল। এরই সূত্র ধরে ধীরে ধীরে তদন্ত এগোতে থাকে। সেখানে বিদ্যুৎ বিলের কপিতে মালিকের নামে ভিন্নতা, ফাতেমার স্বামীর নামসহ সব জায়গায় উদয় মণ্ডল দেখা যায়। এক পর্যায়ে আমরা অনেকটা হতাশ হই। পরে যে নম্বরটিতে রওশন কথা বলতো সে নম্বরটি ট্র্যাকিং করে তরুণ নামে এক যুবকের খোঁজ পাই। এরপর তরুণের সঙ্গে সখ্য গড়ে তার কাছ থেকে রওশনের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত নেয়া হয়। কিন্তু তরুণ জানায়, সেও রওশনকে উদয় মণ্ডল নামে চেনে। তখন রওশনকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। কারণ উদয় মণ্ডলই যে রওশন তা আমরা প্রায় নিশ্চিত ছিলাম।’

‘অবশেষে বিদ্যুৎ বিলের কপিতে দেয়া ঠিকানা রাজশাহীর শাহ মখদুম থানার ভারালীপাড়ায় হঠাৎ করেই রওশনের বাসায় অভিযান চালাই। র‌্যাবের পোশাক পরা অবস্থায় গিয়ে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করলে উদয় মণ্ডল নিজের নাম রওশন বলে স্বীকার করেন। তিনি দুটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং আরও কয়েকটি মামলার আসামি বলেও স্বীকার করেন।’

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘রওশন ছিলেন একজন সিরিয়াল কিলার ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এমনকি তিনি দেশে ছিলেন কি-না, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। সম্প্রতি একটি হত্যা মামলার তদন্তে তিনি রাজশাহী এলাকায় আছেন, এমন তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তের এক পর্যায়ে তার মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। মোবাইল নম্বরটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। পরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য নম্বরটি সচল করেন রওশন। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের সূত্র ধরেই তার বাসার নম্বর খুঁজে পায় র‌্যাব। কিন্তু নাম ভিন্ন হওয়ায়, এ ব্যক্তিই রওশন কি-না, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তবু রাজশাহীর শাহমখদুম থানাধীন ভারালীপাড়া এলাকার ওই বাসায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে তিনি নিজেই কাজী আরেফ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। এছাড়া রওশন ২০০০ সালের ২১ জুন স্কুলশিক্ষক আমজাদ হত্যা মামলার ১ নম্বর চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি বলেও জানান।’

গাজীপুর কথা
গাজীপুর কথা