শনিবার  ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩,   মাঘ ২১ ১৪২৯,  ১৩ রজব ১৪৪৪

Gazipur Kotha | গাজীপুর কথা

মৌলভীবাজারের দুই উপজেলা হানাদারমুক্ত হয় এই দিন

প্রকাশিত: ১৩:০৫, ৫ ডিসেম্বর ২০২২

মৌলভীবাজারের দুই উপজেলা হানাদারমুক্ত হয় এই দিন

মৌলভীবাজারের দুই উপজেলা হানাদারমুক্ত হয় এই দিন

৫ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এইদিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও জুড়ী হানাদার মুক্ত হয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের মিত্রবাহিনীর সাড়াঁশি অভিযানের মুখে বিপর্যস্ত হয়ে দখলদারিত্ব ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী। মুক্তিপাগল বাঙালি উড়িয়ে দেয় স্বাধীনতার পতাকা। দিবসটি পালন উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে সোমবার (৫ ডিসেম্বর)।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল মুনিম তরফদার ও সাবেক ডেপুটি কমান্ডার জয়নাল আাবেদীন জানান, প্রকৃতপক্ষে ৫ ডিসেম্বরই হানাদারমুক্ত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই এখানে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুগত ৬০ জনের একটি দল তৈরি করে শমশেরনগর বিমান ঘাটিতে ট্রেনিং এর কাজ চলতে থাকে। ১০ মার্চ ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলের নেতৃত্বে এক দল পাক সেনা মৌলভীবাজারে অবস্থান নেয়।

তারা আরও জানান, ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে তৎকালীন ছাত্রনেতা নারায়ন পাল ও আব্দুর রহিম পাকিস্তানি পতাকা পুড়ানোর দায়ে গ্রেপ্তার হন। পরে জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা লগ্নে নকশালপন্থিদের নির্মূল করার অজুহাতে মেজর খালেদ মোশারফকে পাঠানো হয়। তিনি ছিলেন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হলে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে জনতার কাতারে সামিল হন।

উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৩টি ঘটনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাত্রখোলা, ধলাই ও ভানুগাছের যুদ্ধ। ন্যাপ নেতা মফিজ আলী, ক্যাপ্টেন মোজাফফর আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. গফুর, ময়না মিয়া, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমান প্রমুখের সাহসী নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসীকতার সঙ্গে লড়েছেন। এখানকার বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন বঙ্গবীর এম. এ. জি. ওসমানী, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, ব্রিগেডিয়ার আমিন আহম্মদ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মতো দেশ বরেণ্য ব্যক্তিরা।

বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান, লেন্সনায়েক জিল্লুর রহমান, সিপাহী মিজানুর রহমান, সিপাহী আব্দুর রশিদ, সিপাহী শাহাজাহান মিয়াসহ নাম না জানা অনেকেই।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ৩ ডিসেম্বর শমশেরনগর এলাকা শক্রমুক্ত করে ৫ ডিসেম্বরে ভানুগাছ এলাকায় মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর কমলগঞ্জ সদর থেকে পাকিস্তানি হানাদাররা পিছু হটে মৌলভীবাজারের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এ মাটিতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে গোটা উপজেলায় হানাদার মুক্ত হয় এ দিনে।

এ ছাড়াও একইদিনে মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলাও মুক্ত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর সশস্ত্র প্রতিরোধর মাধ্যমে জুড়ীকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর দিক নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টরের অধীনস্থ সকল ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভারতের বাগপাশা থেকে ফুলতলার রাঘনা বটুলীতে অগ্রসর হয়ে সীমান্তের জুড়ী নদীর উপর অস্থায়ী ব্রিজ তৈরি করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সীমান্তবর্তী ফুলতলা ইউনিয়ের ফুলতলা বাজার দখল করে নেয় মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী। রাতেই সাগরনাল ইউনিয়নে প্রবেশ করে যৌথবাহিনী। রত্না চা বাগানের নিকটে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হলে উভয় পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা গুলি বিনিময় হলে পিছু হটে পাকিস্তানি বাহিনী।

৪ ডিসেম্বর দিনব্যাপী হানাদার বাহিনীর সাথে যৌথবাহিনীর তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে উভয়পক্ষের বেশ কিছু সৈন্য হতাহতের পর সে রাতে হানাদার বাহিনী পালিয়ে যায়। কাপনাপাহাড় থেকে মুক্তিবাহিনী সৈন্যরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে একদল কুলাউড়া শত্রুমুক্ত করার উদ্দেশ্যে গাজীপুর চা বাগানের রাস্তা ধরে কুলাউড়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

অপর দল জুড়ীর দিকে অগ্রসর হয়। আকাশ ও স্থলপথে যৌথবাহিনীর উপর্যুপরি আক্রমণে জুড়ীতে অবস্থানরত পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী টিকতে না পেরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাতে পালিয়ে যায়। এভাবেই ৫ ডিসেম্বর পাক হানাদার মুক্ত হয় জুড়ী।