• সোমবার   ২৪ জানুয়ারি ২০২২ ||

  • মাঘ ১১ ১৪২৮

  • || ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

গাজীপুর কথা

দেশের জলাশয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়া সাকার মাছ-এর ক্ষতিকর দিক

গাজীপুর কথা

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০২২  

বিগত প্রায় চার দশক জুড়ে অ্যাকোয়ারিয়ামের শোভা বর্ধক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সাকার মাছ এখন দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জলাশয়গুলোতে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা থেকে ধরে এনে অনেকেই এখন শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছেন সাকার মাছ। খাবারের জন্য চওড়া দাম দিয়ে কিনে নিচ্ছেন অনেকেই। তবে বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে দেশের মাছ চাষে মাছটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বদ্ধ এবং উন্মুক্ত উভয় জলাশয়েই এর ক্ষতিকর দিকগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও যথাযথ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু কেন এরকম বিরূপ প্রতিক্রিয়া? চলুন জেনে নিই সাকার মাছের বৈশিষ্ট্য ও এর ক্ষতিকর দিকগুলো।

সাকার মাছ-এর বৈশিষ্ট্য: মাছটির পুরো নাম সাকার মাউথ ক্যাটফিশ (Suckermouth Catfish)। অ্যাকোয়ারিয়াম পালনকারীদের কাছে প্লেকোস্টোমাস বা কমন প্লেকো নামেই বেশি পরিচিত। বর্মযুক্ত ক্যাটফিশ গোত্রের অন্তর্গত এই মাছটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় মিঠা পানির মাছ। এর মাথা এবং শরীরের উপরের অংশকে আবৃত করে রাখে বর্ম-সদৃশ কাটার অনুদৈর্ঘ্য সারি আর মাথা এবং পেটের নীচের পৃষ্ঠটি নগ্ন নরম ত্বক। মুখটি যেন যে কোন কিছু চুষে নেয়ার জন্য উদ্যত, আর এর জন্যই এর বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে হাইপোস্টোমাস প্লেকোস্টোমাস। মুখের এই আকৃতিটি মাছটিকে জলাশয়ের পৃষ্ঠের সাথে লেগে থেকে স্রোতের প্রতিকূলেও খাবার শুষে নিতে সাহায্য করে।

এই সর্বভুক প্রজাতির মাছটি শেওলা, জলজ উদ্ভিদ এবং ছোট ছোট পোনা মাছ খেয়ে থাকে। আশেপাশের যেকোন নড়াচড়ার প্রতি এরা বেশ সংবেদনশীল। এই বৈশিষ্ট্যটি তাদের যেকোনো ধরনের শিকারীকে নিমেষেই এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে। অপরদিকে কোন কারণে এদের ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হলে এরা শরীর থেকে ফেরোমোন নিঃসরণ করে এবং কোনো বিপদ দেখা দিলে লড়াই করার জন্য পূর্ব সংকেত দেয়।

প্রায় ৩৯ ইঞ্চির উত্তর আমেরিকান এই মাছগুলোর ওজন হয় প্রায় দেড় কেজি। তবে বাংলাদেশিগুলো ১৬ থেকে ১৮ ইঞ্চি লম্বা ও ওজনে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

সাকার মাছ-এর ক্ষতিকর দিকগুলো: 

-অন্যান্য মাছ খেয়ে ফেলে

-এই সর্বভূক মাছটি জলাশয়ের পোকামাকড় ও শ্যাওলার পাশাপাশি অন্য ছোট ছোট মাছ বা মাছের পোনাও খেয়ে ফেলে। ফলে চাষিদের মাছ চাষে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়।
 
বিপজ্জনক মাছ:
সাকার মাছের ধারালো পাখনার কারণে অন্য মাছের সঙ্গে লড়াই করার সময় নিমেষেই সেগুলো শিকারের শরীরে ক্ষত তৈরি হয়। এই ক্ষতগুলো পরবর্তীতে সংক্রমণে রূপ নেয়, যা ঠেলে দেয় নির্ঘাত মৃত্যুর দিকে। এতে কমে যায় মাছের সংখ্যা। এমনকি দেশীয় প্রজাতির মাছের ডিম ও রেণু খেয়ে ফেলে মাছের বংশ বিস্তারে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

তবে সাকার কিন্তু শিকারী মাছ নয়। সে শুধু চুষে বা টেনে একসঙ্গে প্রচুর খাবার খায়।

দেশীয় মাছগুলো প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে না এর বংশবৃদ্ধি অন্যান্য মাছ থেকে দ্রুত হওয়ায় উন্মুক্ত জলাশয়ের স্বল্পায়ু, তৃণভোজী, ও খরাকাতর প্রজাতির মাছগুলো মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে সাকার মাছের সাথে খাদ্য ও আবাস নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে না। তাতে প্রায়ই দেশীয় জাতের মাছের বংশগতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিস্ময়কর টিকে থাকার ক্ষমতা:  
এটি পানি ছাড়াই বাঁচতে পারে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। একটি সাকার মাছের জীবনকাল দশ থেকে বিশ বছর, যা অন্যান্য সাধারণ মাছ থেকে দিগুণের চেয়েও বেশি। প্রায় ২২ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে বসবাসরত এই মাছটি যেকোন পরিবেশে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ফলে অন্য মাছের থেকে এরা বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে সক্ষম হয়।

জলাশয়ের পাড় নষ্ট করে: 
এ মাছটির অসংখ্য পোনা জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লে এগুলো জলাশয়ের পাড়ে দেড় মিটার পর্যন্ত গর্ত তৈরি করে ফেলতে পারে। ফলে পাড় ধ্বংস হয়ে যায়।

জলাশয়ের বাস্তুসংস্থান বিনষ্ট করে: 
অত্যাধিক পরিমাণে সাকার মাছের পোনাগুলো দ্রুত পরিণত হয়ে উঠে জলাশয়ের তলার শ্যাওলা ও জৈব আবর্জনা খেয়ে ফেলে। এতে করে জলজ পরিবেশে খাদ্যের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

সাকার মাছ নিয়ন্ত্রণে করণীয়:

-সরকারি উদ্যোগ

-বাংলাদেশ সরকার সাকার মাছ নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেগুলো হলো-

সাকার মাছ বিনষ্টকরণ: উন্মুক্ত ও চাষের বদ্ধ জলাশয়গুলোতে এ মাছ প্রবেশ করছে কিনা তা যথাযথ পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং পাওয়া মাত্রই তা বিনষ্ট করে ফেলতে হবে। যেকোন চাষের জলাশয় শুকিয়ে বা সেচের মাধ্যমে এই বিনষ্টকরণে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

নতুন আইন প্রণয়ন: মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৮৫ আইনে সাকার মাছ নিয়ে নতুন আর্টিকেল সংযোজন করতে হবে। সম্ভাব্য সকল বন্দরে সাকার মাছ আমদানি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।

সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি: যেহেতু সারা দেশেই ছড়িয়ে গেছে, তাই এই মাছ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে উপযোগী উপায় হলো সর্বস্তরে সাকার মাছের ক্ষতিকর দিকগুলোর ব্যাপারে সচেতন করা। যারা অ্যাকোয়ারিয়াম পালন করছেন তারাও যেন ভুলবশত কোন সাকার মাছ পুকুর বা লেকে ফেলে না দেন। নদী-নালা, পুকুরগুলোতে পাওয়া গেলে সেখানেই এই মাছ বিনষ্ট করে ফেলার জন্য স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

বিভিন্ন স্থানের ভুক্তভোগী জেলেরা ইতোমধ্যে তাদের জালে সাকার মাছ ধরা পড়লে তা মাটিতে পুঁতে ফেলে বিনষ্ট করছেন। কেননা তাদের জালে অন্যান্য মাছের সাথে বেশি পরিমাণে সাকার মাছ উঠছে।

গাজীপুর কথা
গাজীপুর কথা