ব্রেকিং:
করোনা আপডেট বাংলাদেশ ২৯/১১/২০২০: করোনা আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় দেশে ২৯ জনের মৃত্যু এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৬০৯, নতুন ১৭৮৮ জনসহ আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৪৬২৪০৭ জন। নতুন ২২৮৭ জনসহ মোট সুস্থ ৩৭৮১৭২ জন। একদিনে ১৩৭৩৭টি সহ মোট নমুনা পরীক্ষা ২৭৫৭৩২৯টি।
  • সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৭

  • || ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

সর্বশেষ:
বঙ্গবন্ধু রেল সেতুর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ২৫ প্রার্থীর নাম ঘোষণা ২৯ নভেম্বর, গাজীপুরে জেএমবির আত্মঘাতী বোমা হামলার ১৫তম বার্ষিকী পদ্মা সেতুতে বসলো ৩৯তম স্প্যান, দৃশ্যমান সেতুর ৫ হাজার ৮৫০ মিটার বছরে প্রতি উপজেলা থেকে এক হাজার কর্মী যাবে বিদেশ ২ ডিসেম্বর মহাকাশে যাচ্ছে বাংলাদেশের ধনে বীজ গাজীপুরে জাল নোটসহ ২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ
৯৪

৭ নভেম্বর ও খালেদ মোশাররফ বীর-উত্তম

গাজীপুর কথা

প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর ২০২০  

আজকে আমি আমার বাবা শহীদ মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর-উত্তম এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সম্পর্কে কিছু কথা বলব। সেই দুঃসময়ের অনেক ঘটনা, অনেক স্মৃতি আজও স্মৃতিতে গেঁথে আছে। সেদিন মা এবং অন্য লোকজনদের কাছ থেকেও অনেক কথা শুনেছি, যা আজ বিভিন্ন লেখকও তাঁদের লেখার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। কেউ সত্য কথাই উল্লেখ করেছেন, আবার কেউ কেউ মিথ্যা-বানোয়াট কথাবার্তা লিখে দেশ ও জাতিকে বিভ্রান্তি করার চেষ্টা করেছেন। তাই মনে করি, খালেদ মোশাররফের সন্তান হিসেবে সেদিনের কথা যতটুকু স্মৃতিতে আছে, তা দেশ ও জাতির সামনে প্রকাশ করা উচিত।

খালেদ মোশাররফ ও ৭ নভেম্বর সম্পর্কে কথা বলতে হলে একটু পেছনের ঘটনা অর্থাৎ ১৫ই আগস্টের ভয়াবহ নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করতে হবে। কারণ খালেদ মোশাররফকে হত্যা ও ৭ নভেম্বরের ভয়াবহতার সঙ্গে ১৫ই আগস্টের যোগসূত্র আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে বিশ্বাসঘাতক খুনি মোশতাকচক্র। মোশতাকচক্র ক্ষমতায় বসেই তার সহযোগী খুনিদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মতোই স্বাধীন বাংলাদেশকেও হত্যা করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হলেও দেশ পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী ফারুক, রশিদ, ডালিম, নূরচক্র। তারা বঙ্গভবনে বসে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের ওপর খবরদারি করছিল। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিল ।

দেশের সেই সংকটময় মুহূর্তে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর একটি সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে খালেদ মোশাররফ খুনি মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত করে বিচারপতি আবু সায়েমকে ৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করেন ।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের আগে কর্নেল শাফায়েত জামিল নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করেছিলেন। মুখে একমত হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। আমরা সবাই জানি তাঁর এই মনোভাবের কারণ। তিনি ছিলেন মোশতাকচক্রের আস্থাভাজন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেই জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছিলেন মোশতাক।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই গৃহবন্দি করা হয় জিয়াউর রহমানকে এবং তাঁর পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতেই খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। কিন্তু এটা লক্ষণীয়, জেনারেল খালেদ মোশাররফ সেই সময় ক্ষমতা দখলের কোনো আগ্রহ দেখাননি। তিনি বিনা রক্তপাতের একটি সফল অভিযান পরিচালনা করেন। এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত একটি পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত মত প্রকাশ এবং সে সময়ের বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার জন্য একমাত্র পথ। যেহেতু তাঁর ক্ষমতার লিপ্সা ছিল না, তাই তাঁর সহযোগীরা তাঁকে বারবার রেডিও ও টেলিভিশনে ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ করলেও তিনি রাজি হননি। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিই শুধু ভাষণ দেবেন, খালেদ এই সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মূল শক্তিকেন্দ্র বা ইউনিটগুলো—ঢাকা ও বাইরের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন, রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে আগত সেনাদল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড চেইন পুনরুদ্ধারে সংকল্পবদ্ধ অফিসাররা খালেদ ও শাফায়েত জামিলের পক্ষে থাকেন। ফারুক-রশিদ অনুগত ট্যাংক ও কামান প্রতিরোধ করার জন্য বিমানবাহিনীর অফিসাররা ব্যবহার করেন মিগ-২১ জঙ্গিবিমান ও এমআই-৮ হেলিকপ্টার। বিমানবাহিনীর মহড়ায় ভীত হয়েই মূলত বঙ্গভবনে মোশতাকের সঙ্গে অবস্থানরত ফারুক-রশিদচক্র পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়।

কিন্তু বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের এই শুভ বার্তাকে মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী। তারা মোশতাক-জিয়া ও কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে খালেদ মোশাররফকে অপসারণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান সফল হলেও বেঙ্গল ল্যান্সার্স আর ২ ফিল্ড আর্টিলারি, যা কি না ফারুক-রশিদ-মোশতাকচক্রকে সমর্থন করেছিল, তাদের তখনো নিরস্ত্র করা হয়নি। তার পরিপ্রেক্ষিতেই ঢাকার রাজপথে তাদের দেখা যায় এবং এই দুটি ইউনিটকেই ব্যবহার করা হয় খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থানের জন্য। সেদিন জিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে আসে টু ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্ট। তাদের সঙ্গে সামরিক বাহিনীতে থাকা জাসদের সেনাবাহিনীর গোপন সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরাও সক্রিয় ছিল। জাসদ সমর্থনকারী এই তথাকথিত বামপন্থী সেনা সদস্যরা এবং মোশতাক-ফারুক-রশিদের অনুগত ডানপন্থী সেনা সদস্যরা—এই দুই গোষ্ঠীই ৭ নভেম্বর হয়ে ওঠে জেনারেল খালেদ মোশাররফের প্রতিপক্ষ।

৩ নভেম্বর বন্দি জিয়া ফোনে কর্নেল তাহেরসহ অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জিয়ার অনুরোধে তাহের তাঁকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন তাঁর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নিয়ে। মোশতাক-জিয়া ও তাহেরচক্র ৫ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ক্যান্টনমেন্টে। এ সময় তারা স্লোগান দেয়—‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, সুবেদারের ওপর অফিসার নাই। সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের কল্লা চাই, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, মেজর জিয়া জিন্দাবাদ, খন্দকার মোশতাক জিন্দাবাদ, নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর।’ এমনকি তারা সৈনিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ঢোকানোর জন্য খালেদ মোশাররফবিরোধী প্রচারণা চালায় এবং খালেদ মোশাররফকে ভারতের চর হিসেবে আখ্যায়িত করে উসকানিমূলক লিফলেট বিলি করে ।

যখন এই বিশৃঙ্খল বাহিনী স্লোগান ও গুলি করতে করতে বঙ্গভবনের দিকে অগ্রসর হয়, অবস্থার অবনতি আঁচ করে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা, কর্নেল হায়দার শেরেবাংলানগরে নির্মাণাধীন সংসদ ভবনে অস্থায়ীভাবে অবস্থানরত দশম বেঙ্গলে যান সেখানের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল নওয়াজিশের আশ্বাসে। কিন্তু সেখানেও যোগ দেয় উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকের একটি দল, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মেজর আসাদ ও জলিল। জিয়ার আদেশেই ৭ নভেম্বর মেজর আসাদ ও জলিলের গুলিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জেনারেল খালেদ, কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দারকে। ঘাতকরা সেদিন তাঁদেরকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। হত্যা করেছে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে ও তাঁদের পরিবারকে।

২ নভেম্বর মাসহ আমাদের গুলশানে নানির বাসায় পাঠিয়ে দেন বাবা। ৩ নভেম্বর ভোরে হেলিকপ্টর ও মিগ ফাইটার বিমানের বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে। কয়েক দিন আমার তিন বোন ও ‘মা’র সঙ্গে বাবার দেখা-সাক্ষাৎ এবং কোনো কথাবার্তা হয়নি। যার জন্য ৬ নভেম্বর সকালে মা ক্যান্টনমেন্টের বাসায় যান। রাত ৭টার সময় বাবা বাসায় আসেন, রাতে একত্রে খাবার খান। এটাই ছিল বাবার সঙ্গে মায়ের জীবনের একত্রে শেষ খাবার।

নানির বাসায় ফিরে আমরা সবাই ঘুমাতে যাই ও মধ্যরাতে ঘুম ভাঙে প্রচণ্ড গোলার শব্দে। শব্দ শোনা যাচ্ছিল ক্যান্টনমেন্টের দিকে। গোলাগুলির শব্দেই বাসার সবাই জেগে ওঠে। ভয় আর আতঙ্কে মা, নানা, নানি কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। এ অবস্থায় আমার এক মামা বললেন, এ বাড়ি আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। কাজেই তাড়াতাড়ি এখান থেকে আমাদের সরে যেতে হবে, এখানে আমাদের থাকা উচিত হবে না। তার পরপরই আমরা মায়ের খালার বাড়ি চলে যাই।

৭ তারিখ সকাল থেকেই মাসহ বাসার সবাইকে চিন্তিত এবং অস্থির অবস্থায় দেখি। আমার দেড় বছরের ছোট শিশুবোন খাওয়ার জন্য কান্না শুরু করে। শিশুবোনের খাওয়ার দুধের বোতল, খাবার ও কাপড়চোপড় আনতে আমার নানি তাঁদের বাসায় যান ৭ তারিখ সকাল ১০টার দিকে। মাসহ আমরা সবাই রাতে যখন নানির বাসা থেকে চলে আসি তখন কোনো কিছুই নিয়ে আসতে পারেননি মা। নানি তাঁদের বাসায় পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে কিছু আর্মি গাড়ি নিয়ে এসে হাজির হয়। তারা গাড়ি থেকে নেমেই জিজ্ঞেস করে, খালেদ মোশাররফের স্ত্রী কোথায়। মাকে না পেয়ে আর্মিরা নানিকে ধরে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু নানি বহু কষ্ট ও চেষ্টা করে পাশের বাসায় গিয়ে জীবন রক্ষা করেন। আর্মিরা একদিকে মাকে খোঁজাখুঁজি করছে, অন্যদিকে বাসার ভেতরে গিয়ে ভয়ংকর ভাঙচুর-লুটপাট করে। সেদিন যদি ঘাতকরা মাসহ আমাদের পেত, তাহলে আমরা হয়তো বাঁচতাম না।

দুপুরের দিকে মায়ের চাচা সংবাদ নিয়ে আসেন। তিনি জানালেন, খালেদ, হুদা ও হায়দারকে হত্যা করা হয়েছে। হঠাৎ বাবার মৃত্যুর সংবাদ শোনে মায়ের অবস্থা কী হতে পারে সবাই বোঝেন। এটা মা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। চার দিন পর বাবার লাশ আনা হলো। তা দেখার পর আরো অন্ধকার লাগছিল, মুখে কোনো ভাষাই ছিল না মায়ের।

আমার বাবা শহীদ মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ নেই। তাঁকে আর কোনো দিন আমরা পাব না। ৪৫ বছর ধরেও বাবা হত্যার বিচারের অপেক্ষায় আছি। আমি জোর দাবি জানাব ৭  নভেম্বরের হত্যার বিচারের। সেদিনের হত্যার সব বিতর্কের অবসানের জন্য তদন্ত করে সঠিক ঘটনা জাতিকে জানাতে হবে। সেই সঙ্গে দোষীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক এবং ৭ নভেম্বরকে কলঙ্কিত দিন হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক হত্যা দিবস ঘোষণা করা হোক রাষ্ট্রীয়ভাবে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

গাজীপুর কথা
স্বাক্ষাৎকার বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর