ব্রেকিং:
করোনা আপডেট বাংলাদেশ ১৭/০১/২০২১: করোনা আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় দেশে ২৩ জনের মৃত্যু এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৯০৬, নতুন ৫৬৯ জনসহ আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৫২৭৬৩২ জন। নতুন ৬৮১ জন সহ মোট সুস্থ ৪৭২৪৩৭ জন। একদিনে ১৩৪৪৬টি সহ মোট নমুনা পরীক্ষা ৩৪৫৭৪৫৩টি।
  • সোমবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২১ ||

  • মাঘ ৫ ১৪২৭

  • || ০৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সর্বশেষ:
মানুষের সেবক হয়েই কাজ করে যেতে চাই: প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন দেখতে বাংলাদেশে আসতে চান বেলজিয়ামের রাজা ফিলিপ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর স্ত্রী বুলাহ আহম্মেদ আর নেই কাকরাইলে মা-ছেলে হত্যা মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনী দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ৯০ শতাংশ সরকারি সেবা ডিজিটালাইজড করা হবে : প্রতিমন্ত্রী পলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি বাড়ল ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে বার্জার পেইন্টস টঙ্গীতে দুস্থ লোকদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরন কালিয়াকৈরে বিভিন্ন জলাশয়ে দেখা মিলছে নানা প্রজাতির অতিথি পাখি শনিবার ১৬ জানুয়ারি, শ্রীপুর পৌরসভা নির্বাচন গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে জন্ম নিল উঠপাখির ৪ ছানা
১১১

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার কলাপাতায় খাওয়ার ঐতিহ্য

গাজীপুর কথা

প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০২১  

পাখিডাকা, ছায়াঘেরা, মায়াভরা, সবুজ পত্র-পল্লভে সুশোভিত, সবুজ-শ্যামলের লীলাভূমি আবহমান বাংলার গ্রামীণ জনপদ। আমাদের শেকড়ের সে উৎসমূলে বসবাস করে নানা ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের সহজ-সরল প্রশস্ত হৃদয়ের সাদামনের মানুষগুলো। তাঁরা দৈনন্দিন জীবনে সদা ব্যস্ত জীবন-জীবিকা, কৃষ্টি-কালচার, উৎসব-পার্বণসহ নানাবিধ কর্মকাণ্ডে। সোনার বাংলায় আবহমান কাল ধরে চর্চিত হয়ে আসছে বিভিন্ন আচার, রীতি-রেওয়াজ। সেসব ঐতিহ্যবাহী চিরচেনা কৃষ্টি-কালচারগুলোর অন্যতম হলো অতিথি পরায়ণ। গ্রামীণ সমাজের জিয়াফত-মেজবানি, চেহলাম, আকিকা, মুসলমানি, পংক্তিভোজ, বিয়ে-শাদী, হরিবাসর, পুজা, হালখাতা, বনভোজন, মেলা, উৎসব-পার্বণ ও বিভিন্ন উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানাদি হতো। এইসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিরনি, তবারক, খাবার বিতরণ করা হতো কলাপাতা। 

এসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত লোকজনদেরকে লম্বা লাইন করে মাটিতে আসন পেতে বসিয়ে কলাপাতার মধ্যে খাবার পরিবেশন করার রীতি প্রচলিত ছিল। শুধু তাই নয়, কলাপাতার পাশাপাশি পদ্মপাতা বা শালপাতাতেও খাবার পরিবেশন করা হতো। কিন্তু পদ্মপাতা বা শালপাতা এখন আর মোটেও চোখে পড়েনা। পদ্মপাতা বা শালপাতায় খাবার পরিবেশনের রেওয়াজ কয়েক যুগ আগেই হারিয়ে গেছে। কলাপাতায় খাওয়া শুধু বাঙালি সমাজের রীতিই নয়, দক্ষিণ ভারতেও কলাপাতায় খাওয়ার প্রচলন আছে। এখনও অনেক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয় কলাপাতা।

কলাপাতায় মিডুরি খাওয়া শুধুই স্মৃতি 

উৎসব-পার্বণ পাগল বাঙালি তাঁর আচার-অনুষ্ঠানাদিতে বাড়ির আঙিনা, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ, মন্দির বা খোলা কোন প্রাঙ্গণে আমন্ত্রিত লোকজনদের কলাপাতায় খাবার পরিবেশন ছিলো কৃষিজীবী সমাজের চিরায়ত ঐতিহ্য। কালের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, মেলামাইন, কাঁচ ও স্টিলের থালা-গ্লাসে পানি ও খাবার পরিবেশন করা হয়ে থাকে। তবে এ ব্যবস্থাও এখন পুরনো হয়ে গেছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন চলছে ওয়ানটাইম গ্লাস-প্লেটে খাবার পরিবেশন। এর মাঝেও গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ও কৃষ্টি কলাপাতায় পংক্তিভোজ হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কদাচিৎ চোখে পড়ে। কোন অনুষ্ঠানে প্রবীণরা এক জায়গায় মিলিত হলে তাদের স্মৃতি রোমন্থন করেন। তাঁরা নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের সময়কার এই ঐতিহ্যবাহী রীতি রেওয়াজ ও অনুষ্ঠানের কথাগুলো রসিয়ে রসিয়ে বলতে শোনা যায় এবং কলাপাতায় জিয়াফত খাওয়ার স্মৃতিচারণ করেন। 

২০-২৫ বছর আগে কলারপাতা ছাড়া কোন মজলিসে খাওয়া হতো না। আত্মীয়-স্বজন ও গ্রামবাসী সবাই মিলে সারি-সারি মাটিতে বসে আলুঘাটি আর ভাত কলাপাতায় রেখে খেতো। প্রবীণদের মতে কলারপাতায় খাওয়ার মজাই আলাদা। কলাপাতায় করে জিয়াফতের ডাল-ভাত, মিডুরি বা হরিবাসরের খিচুরি খাওয়া আজ যেন প্রবীণদের কাছে শুধুই স্মৃতি। 

হারিয়ে যাওয়া কলাপাতা

এদিকে দিনের পর দিন বৈশ্বিক পরিবর্তন, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও নগরায়নে কলাগাছও কমে যাচ্ছে। ফলে কলাপাতাও দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। হারিয়ে গেছে গ্রাম-বাংলার কলাপাতায় ঐতিহ্যবাহী জিয়াফত, মেজবানি, শিরনি ইত্যাদি অনুষ্ঠান। এক সময় কলাগাছের পাতা ছিল মজলিস খাবারের প্রধান আকর্ষণ জিয়াফত-মেহমানি বা মেজবানি ও শিরনির দিন-তারিখ ঠিক হওয়ার ৭/৮ দিন আগে থেকেই কলাপাতা সংগ্রহ করতে ব্যস্ত থাকতো যুবক-ছেলেরা। সে অনুষ্ঠানে খাবার পরিবেশনের জন্য স্থানীয় বিভিন্ন বাগান বা রাস্তার পাশ থেকে কলাপাতা সংগ্রহসহ নানাবিধ আয়োজনের ধুম পড়ে যেত। যান্ত্রিকতা ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় কলারপাতায় মেজবানি খাওয়ার সেই মধুময় স্মৃতি ও ঐতিহ্যের দিনগুলো আর চোখে পড়ে না। তাছাড়া নানাবিদ বিকল্প জিনিষপত্র তৈরি হওয়ায় কলারপাতার ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে।

কলাপাতায় শিরনি খাওয়া

আবহমান বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ছিলো বৈচিত্রময় নানা বাহারী আয়োজনে ভরপুর। মজার মজার শিরনির আয়োজন চিরায়ত বাংলার লালিত ঐতিহ্যের স্মারক। গ্রামের বাড়িতে এসব শিড়নি করা হলে বেশ উৎসবে রূপ নিতো। অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার শেষ দিন ছিলো আনন্দঘন দিন।

* ভোর থেকে শুরু হয়ে মধ্যরাতে বছরের শেষ ধান মাড়াই শেষে একসাথে বসে খাবারদাবার চলতো। সাধারণ খাবারের সাথে বাড়তি যোগ হতো মোরগ পোলাও, কুরমা, মোরব্বা, মাছ বিরানী, সাগুর ক্ষীরসহ নানা রকমের পিঠা-পায়েশ। বাড়ির আশপাশের লোকজন, মসজিদের ইমাম সাহেবকেও দাওয়াত করা হতো।

* নতুন ধানের চারা করার আগে ক্ষীর শিরনি করে আশপাশের ছোট বাচ্চাদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হতো। নতুন ধান কাটার দিনও একই এরকম একটা কিছুর ছোট আয়োজন ছিলো। 

* নতুন গাভী বাচ্চা দিলে ওই গাভীর দুধ দিয়ে শিরনি করে পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েদের ডেকে খাওয়ানো হতো।  
* গ্রামের পাড়ার সকল লোক মিলে বছরে একবার নারিকেল গুড় দিয়ে ক্ষীর রান্না করে খেতো।

* গ্রামের মসজিদ-মাদ্রাসার বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলের আখেরি শিড়নি যা খুবই মজার ছিলো। কলা, দুধ, চিনি/গুড়, নারিকেল দিয়েও মজার শিড়নি তৈরি করে পুরো গ্রাম জুড়ে বণ্টন করা হতো। 

* বছরের মাঘ মাসে চালের গুড়ার ছোট ছোট পিঠার সঙ্গে দুধ গুড় নারিকেল দিয়ে ক্ষীরের মতো একপ্রকার শিরনি তৈরি করে বণ্টন করা হতো। 

* মক্তবে নতুন ছবক নেওয়ার সময় যার যার অবস্থার আলোকে শিরনি দেওয়া হতো। খই, ক্ষির, পোলাও ইত্যাদি খাবার গ্রাম্য সংস্কৃতির অপুরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত নির্দশন। যা পরিবেশন হতো কলাপাতায়।

কলাপাতায় খাওয়ার উপকারিতা

বাড়ির উঠানে কিংবা মাঠে খোলা আকাশের নিচে সমাজের ধনী-গরীব, ফকির-মিসকিন সবাই এক কাতারে মাটিতে বসে কলাপাতায় করে ভাত তরকারী, ক্ষির খাওয়া হতো। নিয়ম যখন তৈরি হয়েছিল তখন সুবিধার খাতিরেই কলাপাতায় খাওয়ার চল হয়েছিল। হয়তো মানুষ জানতও না কলাপাতায় খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী।

* কলাপাতায় পলিফেনল নামক এর রকম পদার্থ থাকে। গ্রিন-টিতেও এই একই পদার্থটি পাওয়া যায়। এটি প্রাকৃতিক অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। খাবার যখন কলাপাতায় পরিবেশন করা হয়, তখন খাবারের সঙ্গে এই পলিফেনল মিশে যায়। ওই খাবার খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

* কলাপাতায় মোমের প্রলেপ থাকে। যখন গরম খাবার কলাপাতায় পরিবেশন করা হয় তখন মোমের প্রলেপ গলে যায়। তা মিশে যায় খাবারের সঙ্গে। ফলে গরম খাবার কলাপাতায় খেলে তা অন্যরকম স্বাদ এনে দেয়।

* কোন অনুষ্ঠানে খাওয়ার জন্য বেশিরভাগ সময়েই প্লাস্টিক বা ফোমের প্লেট ব্যবহার করা হয়। এদিক থেকে কলাপাতা অনেক বেশি পরিবেশ সহায়ক। এটি খুব কম সময়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। প্লাস্টিক বা ফোমের মত পরিবেশের অংশ হতে এটি বেশি সময় নেয় না। ফলে পরিবেশের খাতিরেও কলাপাতা ব্যবহার করা উপযোগী।

* কলাপাতা পরিষ্কার করার দরকার পড়ে না। শুধু, পানি দিয়ে ধুয়ে নিলেই হল। তারপরই তাতে খাবার পরিবেশন করা যায়। অন্তত ফোম বা প্লাস্টিক প্লেটের থেকে এটি অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। এতে কোনও কেমিক্যালও থাকে না। ফলে শরীরের ক্ষতি হওয়ারও কোন সম্ভাবনা নেই।
 
প্রাচীনকালে খাবার পাত্র অপ্রতুল থাকায় মানুষ প্রাকৃতিক বস্তু হিসেবে কলাপাতা, পদ্মপাতা, শালপাতা এবং মাটির গ্লাস অনুষ্ঠানে ব্যবহার করত। এই মাটির গ্লাস ব্যবহারের রেওয়াজটিও অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পদ্মপাতা ও শালপাতার মতো কলাগাছও হারিয়ে যাচ্ছে। আগে বাড়ির আশে-পাশেই হাত বাড়ালেই কলাগাছের পাতা পাওয়া যেত। কিন্তু এখন আর তা পাওয়া যায় না। গ্রামগঞ্জে দু’একটি পরিবার ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে এখনও সেই পুরনো কৃষ্টি ধরে রাখতে কলাপাতায় খাবার পরিবেশন করেন। 

সহজলভ্য, সুস্বাদু, স্বাস্থ্যকর, পরিবেশ সহায়ক কলাপাতায় খাবার পরিবেশনের পুরনো প্রচলনটি হয়তো অল্পদিনেই হারিয়ে যাবে।

গাজীপুর কথা